ক্ষুধার জ্বালায় মায়ের সমাধিতে গিয়ে খাবারের প্লেট হাতে বসে থাকেন তিন ভাই!
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধুলিয়া ইউনিয়নের চাদকাঠী গ্রামের দাসনগর এলাকায় হৃদয়বিদারক এক মানবিক সংকটের চিত্র সামনে এসেছে। বাবা-মা হারানো তিন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভাই ক্ষুধার জ্বালায় প্রায়ই মায়ের সমাধির পাশে গিয়ে খাবারের প্লেট হাতে বসে থাকেন। যেন তারা মৃত মায়ের কাছেই ভাত চেয়ে আকুতি জানাচ্ছেন!
গ্রামের একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে তিন ভাই—রিপন দাস, সাধন দাস ও নিদু দাসের। জন্ম থেকেই বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতায় ভুগছেন তারা। সাধন দাস দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, আর রিপন ও নিদু বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ফলে নিজেদের চাহিদা কিংবা কষ্টের কথাও তারা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত বছর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রতন চন্দ্র দাস মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব কাঁধে নেন মা সরস্বতী রানী। লিভার ও কিডনির জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েও তিনি তিন ছেলেকে আগলে রেখেছিলেন। কিন্তু গত মাসে তিনিও মারা গেলে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন তিন ভাই।
প্রতিবেশীরা জানান, ক্ষুধা লাগলেই তিন ভাই খাবারের প্লেট হাতে বাড়ির উঠানে থাকা মায়ের সমাধির পাশে গিয়ে বসে থাকেন। এই দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায় এবং তা স্থানীয়দেরও আবেগাপ্লুত করে।
প্রতিবেশী সঞ্চিতা পাল বলেন, একবেলা খাবার খেলে দুই বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। আমরা যতটুকু পারি সাহায্য করি, কিন্তু সব সময় তো সম্ভব হয় না। সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে তাদের উপকার হতো।
আরেক প্রতিবেশী অমিত বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পরও মা অনেক কষ্ট করে সন্তানদের দেখাশোনা করেছেন। এখন মা-ও নেই, তাদের দেখার মতো কেউ নেই।
পাঁচ ভাইবোনের এই পরিবারের বড় বোন দীর্ঘদিন আগে ভারতে চলে গেছেন। অপর এক ভাই দিনমজুরের কাজ করে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য তারও নেই।
বর্তমানে প্রতিবেশীদের সহায়তায় কোনোভাবে দিন পার করছেন তারা। কেউ খাবার দিলে খেতে পারেন, না হলে অনেক সময় উপোসেই থাকতে হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা না পৌঁছালে তারা আরও বড় মানবিক সংকটে পড়বেন।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালেহ আহমেদ জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন ভাইকে ৫০ কেজি চাল ও ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের সুস্থ ভাইয়ের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি তিন ভাইয়ের জন্য স্থায়ী খাদ্য, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। তাদের মতে, সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে এই অসহায় তিন ভাইয়ের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে