আলোর প্রযুক্তিতে দ্রুত রোগ শনাক্তে যুগান্তকারী গবেষণায় তিন বাংলাদেশি
আলোর উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করার নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন তিন বাংলাদেশি তরুণ গবেষক—এস. এম. রাকিবুল ইসলাম, মোহাম্মদ রুবায়েত ইসলাম এবং মোহাম্মদ সবুজ মিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের লামার ইউনিভার্সিটিসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তারা এই গবেষণা পরিচালনা করছেন।
গবেষকদের মতে, আলোর সাহায্যে তৈরি অত্যন্ত সংবেদনশীল সেন্সরের মাধ্যমে রক্ত বা কোষের ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও শনাক্ত করা সম্ভব। ফলে জটিল রোগগুলোও শুরুতেই ধরা পড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
এই গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে ফোটোনিক ক্রিস্টাল ফাইবারভিত্তিক অপটিক্যাল বায়োসেন্সর। এই বিশেষ ফাইবারের ভেতরে সূক্ষ্ম বায়ুছিদ্রযুক্ত মাইক্রোস্ট্রাকচার থাকে, যা আলো ও জৈবিক উপাদানের মধ্যে শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে। ফলে কোষ বা রক্তে সামান্য পরিবর্তন হলেও তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যায়।
প্রযুক্তিটিকে আরও কার্যকর করতে গবেষকরা সারফেস প্লাজমন রেজোন্যান্স (এসপিআর) পদ্ধতিও যুক্ত করেছেন। এতে ফাইবারের ওপর সোনার মতো পাতলা স্তর ব্যবহার করা হয়। যখন কোনো জৈবিক নমুনা সেন্সরের সংস্পর্শে আসে, তখন আলোর আচরণে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে—যা বিশ্লেষণ করে রোগের সম্ভাবনা নির্ধারণ করা যায়।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন গ্লুকোজ, হিমোগ্লোবিন, অ্যালবুমিন ও ইউরিয়া শনাক্ত করা সম্ভব। এসব উপাদানের মাত্রা বিশ্লেষণ করে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, লিভারের সমস্যা এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ক্যান্সার কোষের অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য সাধারণ কোষের তুলনায় ভিন্ন। বিশেষ করে প্রতিসরণাঙ্কে সামান্য পরিবর্তন ঘটে, যা শনাক্ত করা গেলে ক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থাতেই ধরা সম্ভব হতে পারে।
গবেষক এস. এম. রাকিবুল ইসলাম বলেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জৈবিক নমুনার খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তনও ধরা সম্ভব, যা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মোহাম্মদ রুবায়েত ইসলাম জানান, ফাইবারের নকশা উন্নত করলে সেন্সরের সংবেদনশীলতা আরও বাড়ানো যায়, যা জৈব-চিকিৎসা নির্ণয় ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। আর মোহাম্মদ সবুজ মিয়া বলেন, তাদের লক্ষ্য এমন একটি সহজ, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি তৈরি করা, যা হাসপাতালের বাইরেও ব্যবহার করা যাবে।
গবেষকদের আশা, প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে ছোট ও বহনযোগ্য রোগ নির্ণয় যন্ত্র তৈরি সম্ভব হবে। এতে দূরবর্তী এলাকাতেও দ্রুত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা যাবে এবং অনেক রোগ আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোকভিত্তিক এই ধরনের প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে