Views Bangladesh Logo

জুনে ‘ভূতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিল, দেশজুড়ে গ্রাহকের প্রশ্ন ‘চুরি না ডাকাতি’

প্রতি বছরের মতো এবারও জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে দেশজুড়ে অভিযোগের ঝড় উঠেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রাম, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও জুন মাসে বিল কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। একই অভিযোগ এসেছে প্রিপেইড ও পোস্টপেইড—উভয় ধরনের মিটারের গ্রাহকদের কাছ থেকেই।

গ্রাহকদের দাবি, বাসায় নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি, বরং লোডশেডিংও ছিল। তারপরও জুন মাসের বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা তারা পাচ্ছেন না। ক্ষোভে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, এটা কি চুরি না ডাকাতি?

দেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর বড় অংশ এখনো পোস্টপেইড মিটার ব্যবহার করেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয় না। কোথাও অনুমাননির্ভর বিল করা হয়, আবার কোথাও কয়েক মাসের ইউনিট একসঙ্গে হিসাব করে বিল দেওয়া হয়। ফলে অনেক গ্রাহক উচ্চতর ট্যারিফ স্ল্যাবে চলে গিয়ে অতিরিক্ত বিলের মুখে পড়ছেন।

বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মিটার রিডিংয়ে অনিয়ম, বিলিং ত্রুটি এবং কয়েক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যোগ হওয়ার মতো কারণে অনেক সময় বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তবে খাতসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, অর্থবছরের শেষে রাজস্ব আয় বা সিস্টেম লসের হিসাব নিয়েও কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়েছে।

রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র
আদাবরের এক বাসিন্দার মাসিক বিদ্যুৎ বিল সাধারণত দেড় হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও জুনে তার বিল আসে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। পরে বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে জানা যায়, মিটার রিডিংয়ে একটি ডিজিট ভুল হওয়ায় এমন বিল হয়েছিল। সংশোধনের পর বিল নেমে আসে ১ হাজার ৪৬০ টাকায়।

নিকেতনের এক গ্রাহকের মে মাসে বিল ছিল প্রায় ৬ হাজার ৮৪২ টাকা। জুনে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ৯০৯ টাকা। নারায়ণগঞ্জের এক গ্রাহকের বিল ৬ হাজার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১ হাজার ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজনের ১ হাজার ৭০০ টাকার বিল বেড়ে প্রায় ৪ হাজার টাকা হয়েছে, আরেকজনের ৬ হাজার টাকার বিল হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসি ছাড়াই এক গ্রাহকের বিল ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৭৬৬ টাকা হয়েছে। কুড়িগ্রামের উলিপুরে একটি ফ্যান ও একটি বাল্ব ব্যবহারের পরও এক গ্রাহকের হাতে এসেছে ৭ হাজার ২০০ টাকার বিল।

হবিগঞ্জে আবার এক নারী গ্রাহকের নামে ভুলবশত ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল ইস্যু হয়। পরে কর্তৃপক্ষ সেটিকে কম্পিউটারজনিত ত্রুটি বলে সংশোধন করে।

প্রিপেইড মিটারেও অভিযোগ
শুধু পোস্টপেইড নয়, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের মধ্যেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার এক গ্রাহক জানান, মাত্র ১৩ দিনে প্রায় ৯ হাজার টাকার রিচার্জ করতে হয়েছে, যেখানে অন্য মাসে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় পুরো মাস চলে যেত।

আরেক গ্রাহকের অভিযোগ, কয়েক দিনের ব্যবধানে মিটার থেকে বারবার বড় অঙ্কের টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে, যদিও বাসায় কেবল ফ্যান, লাইট ও ফ্রিজ ব্যবহার করা হয়। নেসকোর এক গ্রাহকের দাবি, এক হাজার টাকা রিচার্জ করার তিন দিনের মধ্যেই প্রায় ৩৫০ টাকা কমে যায়।

অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ব্যাপক অভিযোগের পর ২ জুলাই বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সব বিতরণ কোম্পানিকে অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত, বিলিং বা কারিগরি ত্রুটি থাকলে তাৎক্ষণিক সংশোধন এবং অসদুপায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এদিকে, রাজশাহীতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে ভূতুড়ে বিল বাতিল, প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের ভিত্তিতে নতুন বিল, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বিল সমন্বয় এবং বিশেষ অভিযোগ সেল গঠনের দাবি জানিয়েছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। মিটার রিডিং ও বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এমন সমস্যা চলতেই থাকবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, জুনে তাপমাত্রা বেশি থাকায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। এছাড়া বিদ্যুতের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগ পাওয়া অধিকাংশ বিল যাচাই করে সঠিক পাওয়া গেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমকে বলেন, কয়েকটি এলাকায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ সেল চালু করা হয়েছে। সেখানে যোগাযোগ করলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ