স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়ার, টিফিনের টাকায় বিমান বানাল সামিউল
রংপুরের মিঠাপুকুরের আকাশে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে নিজের তৈরি বিমান উড়িয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ১৫ বছরের কিশোর সামিউল ইসলাম। পাইলট কিংবা যাত্রী ছাড়াই পাখির মতো আকাশে উড়ে বেড়ানো এই বিমান দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ।
সামিউল ইসলামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের রামেশ্বরপাড়ায়। স্থানীয় শঠিবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। ছোটবেলা থেকেই আকাশে বিমান দেখলে তার মনে নানা কৌতূহল তৈরি হতো। সেই আগ্রহ থেকেই ইউটিউবে বিমান তৈরির বিভিন্ন ভিডিও দেখতে শুরু করে সামিউল। একপর্যায়ে ভিডিও দেখে নিজেই বিমান তৈরির উদ্যোগ নেয়।
বিমান তৈরির জন্য নিজের টিফিনের টাকা জমাতে শুরু করে সে। প্রায় এক মাসের চেষ্টায় তৈরি করে ৫৪ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিমান। এতে ব্যবহার করেছে ২২০০ কেভির একটি মোটর। বিমানটি তৈরি করতে তার প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। শুরুতে টিফিনের টাকা দিয়ে কাজ শুরু করলেও পরে প্রয়োজন অনুযায়ী বাবা ও চাচাদের কাছ থেকেও অর্থ নেয় সে।
সামিউল জানায়, তার তৈরি বিমানটি প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশে উড়তে পারে। শুরুতে ছেলের এই কাজে পরিবারের সদস্যরা কিছুটা আপত্তি করেছিলেন। পড়াশোনার সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তাকে ধমকও শুনতে হয়েছে। তবে এতে দমে যায়নি সে। নিজের চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বিমানটি আকাশে ওড়াতে সক্ষম হয়েছে।
সামিউলের তৈরি বিমানটি এখনো কোনো কিছু বহন করতে পারে না। তবে তার স্বপ্ন অনেক বড়। ভবিষ্যতে মানুষ বহনে সক্ষম জেট বিমান তৈরি করতে চায় সে। একই সঙ্গে বিমান প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করে দেশের বেসামরিক বিমান খাতে কাজ করার স্বপ্নও রয়েছে তার।
নিজের তৈরি বিমান নিয়ে সামিউল এখন এলাকার মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। দূর-দূরান্ত থেকে শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ বিমানটি দেখতে আসছেন। শহর থেকেও গণমাধ্যমকর্মী ও কনটেন্ট নির্মাতারা ছুটে যাচ্ছেন তার উদ্ভাবন দেখতে।
সামিউলের সহপাঠী রবিউল ইসলাম বলেন, সামিউলের জন্য তারা গর্বিত। অল্প সময়ের মধ্যে নিজের চেষ্টায় বিমান তৈরি করে সেটি উড়াতে সক্ষম হয়েছে সে। ভবিষ্যতে সামিউল বিমান তৈরির কাজে যুক্ত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা তার সহপাঠীদের।
সামিউলের মা আমেনা বেগম বলেন, ছেলে বিমান তৈরি করেছে, এতে তিনি খুব খুশি। তার ইচ্ছা, সামিউল ভবিষ্যতে বিমান তৈরির কাজেই এগিয়ে যাক। এ জন্য সরকারি সহযোগিতা পেলে তার ছেলের স্বপ্ন পূরণে আরও সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করেন তিনি।
সামিউলের শিক্ষক আব্দুল হামিদ বলেন, সামিউল শান্ত স্বভাবের শিক্ষার্থী। তবে তার মধ্যে এমন উদ্ভাবনী প্রতিভা রয়েছে, তা আগে এতটা জানা ছিল না। তার তৈরি বিমান আকাশে উড়তে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। এ ধরনের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের একজন কিশোরের সামনে গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ খুব বেশি নেই। তারপরও আগ্রহ, স্বপ্ন ও নিজের মতো করে শেখার চেষ্টা থেকে সামিউল রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিমান তৈরি করেছে। বিজ্ঞানমনস্ক শিশু-কিশোরদের এমন উদ্যোগে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ছোট ছোট প্রচেষ্টাকে বড় পরিসরে নেওয়ার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, অতীতেও অনেক শিশু-কিশোরের উদ্ভাবনী উদ্যোগ নজর কেড়েছে। কিন্তু যথাযথ মূল্যায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকের স্বপ্ন হারিয়ে গেছে। সামিউলের উদ্যোগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তার স্বপ্নকে আরও বড় পরিসরে বিকশিত করার সুযোগ তৈরি করা গেলে অন্য কিশোররাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী হবে।
মতামত দিন