বিজয় দিবসের আগেই ঢাবির ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য সংস্কারের দাবি ছাত্র ফেডারেশনের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের ব্যস্ত সড়কের পাশে চরম অবহেলায় পড়ে আছে ভাস্কর শামীম শিকদারের ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য প্রাঙ্গণটি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরবর্তী সহিংসতায় দেশের অন্যান্য স্থানের মতো এই প্রাঙ্গণে থাকা ১১৬টি ভাস্কর্যের প্রায় সবকটিই ভাঙচুর করা হয়।
বর্তমানে কোনো ভাস্কর্যের মাথা নেই, কোনোটির মুখাবয়ব কিংবা হাত-পা ভাঙা। সাত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্যসহ মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁইয়ের মতো মনীষীদের প্রতিকৃতি আজও বিকৃত অবস্থায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও এসব ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ভেঙে ফেলা ভাস্কর্য সংস্কার না করার প্রতিবাদে সম্প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ প্রাঙ্গণের ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্যগুলোর চোখ ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে দ্রুত সংস্কার, পুনর্নির্মাণ ও যথাযথ সংরক্ষণের দাবি জানান তাঁরা।
ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈকত আরিফ বলেন, জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্যগুলো রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক একটি ভাস্কর্য চত্বর প্রায় দুই বছর ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকা গ্রহণযোগ্য নয়।
তারা আগামী বিজয় দিবসের আগেই ভাস্কর্যগুলো সংস্কার করে উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন এবং এ বিষয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি প্রদান করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শুধু ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নয়, ক্যাম্পাসের ক্ষতিগ্রস্ত সব ভাস্কর্য সংস্কারের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তবে সংস্কারকাজ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি।
উপাচার্য আরও বলেন, প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে বৈঠক করে ভাস্কর্যগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন বলেন, ভাস্কর্যগুলো নিয়ে একটি কমিটি হয়েছে। তবে যেসব শিল্পী এগুলো নির্মাণ করেছেন, তাদের মতামত নেওয়া জরুরি। শিল্পীদের মতামত পাওয়া না গেলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিজেদের উদ্যোগেই সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
চারুকলা অনুষদের ডিন শেখ আজহারুল ইসলাম বলেন, ভাস্কর্যগুলো নিয়ে এর আগে একাধিক বৈঠক হয়েছে। ভাস্কর শামীম সিকদার মারা যাওয়ায় এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোনো শিল্পীর সৃষ্টি ভেঙে যাওয়ার পর সেটি পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল শিল্পীর মতামতের প্রশ্ন আসে। দেশে ভাস্কর্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের ঘাটতিও রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে ‘আমার একুশে’ নামে শুরু হওয়া এই শিল্পকর্মটি ১৯৯৮ সালে বর্তমান স্থানে স্থানান্তর ও সম্প্রসারণের পর ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নামকরণ করা হয়। ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ উদ্বোধন করা এই প্রাঙ্গণে মূল ভাস্কর্যের চারপাশে ১১৬টি প্রতিকৃতির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
মতামত দিন