ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগ, শাবি শিক্ষার্থীকে ছাত্রদল ২ নেতার মারধর
ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিযোগ করার জেরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে।
শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খাইরুল খন্দকারকে মারধর করা হয় বলে তিনি নিজে এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। শাহপরাণ হলের আবাসিক এই শিক্ষার্থীকে সিলেট নগরীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান।
এই ঘটনায় অভিযোগের মুখে থাকা দুজন হলেন পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের যোগাযোগ সম্পাদক হাসিবুর রহমান এবং পরিসংখ্যান বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও সহ-দপ্তর সম্পাদক তারেক রহমান, যারা দুজনেই একই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
এই ঘটনার প্রতিবাদে ও জড়িতদের বিচারের দাবিতে শনিবার রাত ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এরপর রাত সাড়ে ৩টার দিকে সেখানে গিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম তিন কার্যদিবসের মধ্যে ঘটনা তদন্ত করে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
প্রত্যক্ষদর্শী অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার বিন সেলিম জানান, ঘটনার সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের একটি দোকানে বসে ছিলেন, তখন দেখেন পরিসংখ্যান বিভাগের তারেক ও পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের হাসিবের সঙ্গে খাইরুলের তর্কাতর্কি হচ্ছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে তাদের ঝামেলা না করতে বলেন এবং বিভাগের সিনিয়রদের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেন। তার ভাষ্য, তখন তারেক তাকে হলের ফেসবুক গ্রুপে ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে খাইরুলের করা অভিযোগের কথা জানান। দুই পক্ষের কথা শোনার একপর্যায়ে খাইরুল বলেন, তিনি দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলে বলেন এ নিয়ে কথা বলার হলে তিনি হল প্রভোস্টের সঙ্গেই বলবেন। আবরারের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর হাসিব খাইরুলের বুকে লাথি মারেন, এতে তিনি মাটিতে পড়ে যান, আর তারেক তখন তার ঘাড়ের ওপরের অংশে আঘাত করতে শুরু করেন। আবরার বলেন, এমন নির্মম মারধর তিনি জীবনে দেখেননি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী খাইরুল খন্দকার বলেন, শাহপরাণ হলের ক্যান্টিনে পচা মাছের তরকারি পরিবেশনের অভিযোগ তুলে প্রভোস্টকে মেনশন দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পোস্ট দেওয়ার পর শুক্রবার বিকেলে ছাত্রদলের তারেক তাকে এক বন্ধুর মাধ্যমে ডেকে পাঠান। তার কাছে গেলে তারেক জানান, এই পোস্টের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনক্ষুণ্ন হয়েছেন, যিনি আসলে হল প্রভোস্ট। এরপর তারেক তাকে প্রভোস্টের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন, কিন্তু তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। খাইরুলের ভাষ্য, সেই রাতেই ক্যান্টিনে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন দেখে তিনি আবারও প্রভোস্টকে মেনশন করে একই গ্রুপে পোস্ট দেন। এর জেরে শনিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে হাসিব ও তারেক তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, আর তিনি একই কথা বললে হাসিব তার বুকে লাথি মারেন এবং তারেক মাথার পেছনে ও মুখে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। পরে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে সিনিয়র ও বন্ধুরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান বলে জানান খাইরুল।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক তারেক রহমান বলেন, হলের গ্রুপে খাবার নিয়ে পোস্টের কারণে প্রভোস্ট মন খারাপ করেছিলেন, আর তিনি বিষয়টি খাইরুলকে বোঝাচ্ছিলেন। তার দাবি, জুনিয়র হয়েও খাইরুল তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং একপর্যায়ে তেড়ে এসে তার গায়ে হাত দেন, তখন হাসিব বাধা দিতে গেলে ঘটনা হাতাহাতিতে গড়ায়। তারেক আরও বলেন, এই ঘটনায় হাসিবের চশমা ভেঙেছে, হাত কেটেছে এবং তার ফোনও নষ্ট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে জানতে হাসিবুর রহমানকে ফোন করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিজের নাম উল্লেখ করে পোস্ট দেওয়ার পরই এই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগের বিষয়ে শাহপরাণ হলের প্রভোস্ট ইফতেখার আহমদ বলেন, এখানে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং কাউকে মারধরে তিনি মদদও দেননি। তার ভাষ্য, হলের কোনো সমস্যা নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী অভিযোগ করলে তিনি তাকে ডেকে কথা বলে সমাধান করেন, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী তার কাছে সমান।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।
মতামত দিন