সংস্কারের পক্ষে কথা বলা বর্তমান সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব: প্রেস উইং
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়, বরং এটি সরকারের একটি নৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক বক্তব্যে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশ্য সমর্থন গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সম্প্রতি কিছু মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, সংস্কারের পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তবে প্রেস উইং বলছে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নজির বিবেচনায় নিলে এসব সমালোচনার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই।
আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, দেশের বর্তমান সংকটময় বাস্তবতায় নীরব থাকা নিরপেক্ষতার লক্ষণ নয়; বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবকে নির্দেশ করে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রীয় সংকটের সময় সরকারপ্রধান ও সরকার যদি জনগণের সামনে স্পষ্ট অবস্থান না নেয়, তাহলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে আরও দুর্বল করে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার কেবল দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিনের অপশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর রাজনীতিকরণ এবং জনগণের আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
প্রেস উইংয়ের বক্তব্যে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব হলো—রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা
উপ-প্রেস সচিব বলেন, গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই বাস্তব প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, যে সরকার সংস্কারের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত, সেই সরকার গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মুহূর্তে সংস্কারের প্রশ্নে নীরব থাকবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চায় অন্তর্বর্তী বা নির্বাচিত—কোনো সরকারপ্রধানেরই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নীরব থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। বরং গণতন্ত্রে প্রত্যাশা করা হয়, নেতারা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেবেন।
তিনি বলেন, গণভোট কোনো টেকনোক্র্যাটিক বা আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এটি জনগণের সরাসরি মতামত জানানোর একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সরকার যখন তার যুক্তি ও অবস্থান পরিষ্কার করে, তখন ভোটাররা আরও সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
প্রেস উইংয়ের বক্তব্যে একাধিক আন্তর্জাতিক নজির তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
যুক্তরাজ্য (২০১৬): ব্রেক্সিট গণভোটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউতে থাকার পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালান
স্কটল্যান্ড (২০১৪): স্বাধীনতা গণভোটে ‘ইয়েস স্কটল্যান্ড’ প্রচারণার নেতৃত্ব দেন ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যালমন্ড
তুরস্ক (২০১৭): প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সাংবিধানিক সংশোধনের পক্ষে দেশজুড়ে প্রচারণা চালান
ফ্রান্স (১৯৬২): প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তনে গণভোট আহ্বান করেন
এসব ক্ষেত্রেই সরকারপ্রধানদের অবস্থান নেওয়াকে গণতন্ত্রবিরোধী নয়, বরং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
উপ-প্রেস সচিব বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনি স্বার্থ বা ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্য জড়িত নেই। সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক দায়ভার বহন করবে নির্বাচিত সরকার।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সময়সীমাবদ্ধ এবং তাদের ভূমিকা সীমিত। ফলে অযথা প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা বাস্তব নয়।
জেলা পর্যায়ে সরকারি সম্পৃক্ততা নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রেস উইং জানায়—এর উদ্দেশ্য হলো সংস্কারের বিষয়বস্তু জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি দূর করা।
আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, সংকটকালে সরকারের তথ্যভিত্তিক সম্পৃক্ততা স্বাভাবিক। এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জবরদস্তিমূলক প্রচারণা বলা ঠিক নয়।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে