Views Bangladesh Logo

আইসিডিডিআরবির সাম্প্রতিক গবেষণা

হাসপাতালেই বাসা বাঁধছে ‘সুপারবাগ’, আইসিইউতে সংক্রমিত রোগীর মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) এমন সব অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যেগুলোর চিকিৎসা প্রচলিত ওষুধে আর সম্ভব হচ্ছে না। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা নিলে এই মারাত্মক পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)।

শনিবার (২৫ জুলাই) আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণা কেন্দ্রটি এ তথ্য জানায়। প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি পৃথক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকার একটি সরকারি টারশিয়ারি হাসপাতালে পরিচালিত গবেষণা দুটিতে দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তির সময় সংক্রমণমুক্ত থাকা রোগীদের অর্ধেকের বেশিই পরবর্তীতে হাসপাতালের ভেতরেই ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।

‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ জার্নালে প্রকাশিত প্রথম গবেষণাটি চালানো হয় ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, ঢাকার ওই হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় মূলত চারটি সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার ওপর নজর দেওয়া হয়—এশেরিকিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া, অ্যাসিনেটোব্যাক্টর বাউমানি ও সিউডোমোনাস অ্যারুগিনোসা, যেগুলো নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ, মূত্রনালির সংক্রমণ ও ক্ষতস্থানের সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

গবেষণায় দেখা যায়, ভর্তির সময় ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ছিলেন এমন ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জন বা ৫৩ শতাংশই আইসিইউতে অবস্থানকালে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হয়েছেন। ল্যাব পরীক্ষা ও পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, রোগীর শরীরে বহন করা ব্যাকটেরিয়া কীভাবে পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নেয়। উদ্বেগের বিষয়, নিশ্চিতভাবে সংক্রমিত রোগীদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি আইসিইউতে মারা গেছেন।

আইসিডিডিআরবির সহকারী বিজ্ঞানী ও গবেষণাটির প্রধান লেখক গাজী মো. সালাহউদ্দিন মামুন জানান, রোগীদের আইসিইউতে ভর্তির শুরু থেকে হাসপাতাল ছাড়ার আগ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, যাতে রোগীর শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং পরবর্তী প্রাণঘাতী সংক্রমণের মধ্যে সংযোগ চিহ্নিত করা যায়।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’ জার্নালে প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ), ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৬৩ জন নবজাতকের ওপর। এতে দেখা গেছে, শুধু প্রাপ্তবয়স্ক আইসিইউ রোগীই নন, নবজাতকদের ক্ষেত্রেও হাসপাতালের ভেতরে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ একইভাবে উদ্বেগজনক হারে ঘটছে। এর আগে আইসিডিডিআরবির আরেকটি গবেষণায় হাসপাতাল ও সমাজে নবজাতকসহ ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব ব্যাকটেরিয়ার বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছিল।

তবে গবেষণায় ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। ধারাবাহিকভাবে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করলে তা বাস্তবে সুফল বয়ে আনে বলে প্রমাণ মিলেছে। সাত মাস ধরে কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পর আইসিইউতে রক্তে সংক্রমণের হার প্রতি ১০০ জনে ২৮ থেকে কমে ৪-এ নেমে আসে, অর্থাৎ সংক্রমণ কমে ৮৬ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যুহারও প্রতি ১০০ জনে ২৬ থেকে কমে ৪-এ দাঁড়ায়।

আইসিডিডিআরবির অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ও গবেষণার প্রধান তদন্তকারী ডা. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল নিরাময়ের জায়গা হওয়া উচিত, চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা যেন উল্টো প্রাণঘাতী সংক্রমণের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করা, হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা এবং দায়িত্বশীলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, গবেষণার ফলাফল স্পষ্ট করে দেয় যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই রোগীরা বিপজ্জনক ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এর পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। তবে তিনি এ-ও উল্লেখ করেন যে সাধারণ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ