Views Bangladesh Logo

সুচিত্রা সেন: পাবনার মেয়ে হয়ে উঠলেন বাংলা সিনেমার কিংবদন্তী

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম সুচিত্রা সেন। আজ সুচিত্রা সেনের ৯৫তম জন্মবার্ষিকী। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল, তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের পাবনা জেলায়।

সূচিত্রা সেন শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে তিনি বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের অন্যতম মুখ ছিলেন। তার অভিনীত ‘দেবী’, ‘সপ্তপদী’, ‘অভিযান’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্র আজও দর্শকদের হৃদয়ে সমাদৃত। রীতিমতো বলা চলে, তিনি বাংলা সিনেমায় এক নতুন ব্যঞ্জনা এনে দিয়েছিলেন।

তিনি শুধু কলকাতার ইন্ডাস্ট্রিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বাংলাদেশের সাধারণ দর্শকও তাকে সমান ভালোবাসত। তার অভিনয়ে ছিল এক অনবদ্য কমনীয়তা ও গাম্ভীর্য। মুখের অভিব্যক্তি আর চোখের ভাষায় তিনি জানতেন কীভাবে দর্শকের মন কেড়ে নিতে হয়। ‘সপ্তপদী’ সিনেমায় তার সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘আমি তোর পরশমণি’ আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরে।

পাবনার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী পরে কলকাতায় পাড়ি জমান, কিন্তু তার শিকড় কিন্তু এপার বাংলাতেই।

এপার বাংলার মেয়ে, ওপার বাংলার তারকা
সূচিত্রা সেনের জন্ম পাবনা জেলায়। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ও মা ইন্দিরা দেবী। ছোটবেলায় তাঁর নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। সেই রমাই একদিন হয়ে ওঠেন সূচিত্রা সেন। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মনের কোনায় তিনি চিরকাল ‘পাবনার মেয়ে’ হয়েই রয়েছেন। ঢাকার পুরান ঢাকার গলি থেকে গ্রাম বাংলার প্রান্তিক প্রান্তরেও সূচিত্রা সেনের ছবি পৌঁছে গিয়েছিল এক সময়। কারণ, বাংলাদেশের দর্শকের কাছে তিনি কোনো বিদেশি তারকা নন; তিনি আপন মানুষ।

ঢাকার সঙ্গে যে সম্পর্ক ভোলার নয়
পঞ্চাশের দশকে ঢাকার প্রেক্ষাগৃহগুলোয় যখন সূচিত্রা সেনের ‘আকাশপাতাল’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘হারানো সুর’ সিনেমা মুক্তি পেত, তখন টিকিট পাওয়া যেত না। পুরান ঢাকার গুলিস্তান, বালুর মাঠ, শাবিস্তান—সব জায়গায় তখন সূচিত্রা সেনের ঢল নামত। ঢাকার সিনেমাপ্রেমী মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সূচিত্রা সেন ছিলেন ‘গৃহদেবী’। তাঁর সেই মায়াবী হাসি, চোখের ভাষা আর কণ্ঠের মায়া বাঙালি দর্শককে নাড়া দিত।

সিনেমা নয়, এক ইতিহাস
উত্তাল পঞ্চাশের দশকে ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—এসবের মধ্যেই বাংলাদেশের মানুষ খুঁজে পেত সূচিত্রা সেনের সিনেমায় স্বপ্নের ঠিকানা। ‘সপ্তপদী’ সিনেমায় উৎপল দত্তের সঙ্গে তাঁর সংলাপ ‘আমি তোর পরশমণি’ আজও বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত প্রচার হয়। ‘দেবী’ সিনেমায় এক নারীকে দেবীর আসনে বসিয়ে দেওয়ার গল্প যেমন সমাজের রূঢ় বাস্তবতা দেখিয়েছে, তেমনি সূচিত্রা সেনের অভিনয় দর্শককে ভাবিয়েছে।

শিল্পের এক অনন্য উচ্চতা
সূচিত্রা সেন শুধু সিনেমা করেননি, তিনি বাংলা সিনেমাকে সম্মান এনে দিয়েছেন। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী দেয়, ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার—যা ভারতের চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান। কিন্তু এই পুরস্কার ও স্বীকৃতির বাইরেও বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন আন্তরিক ভালোবাসা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পোস্টার, দেয়ালিকা, ক্যালেন্ডার—সব জায়গায় ছিল সূচিত্রা সেনের ছবি।

নীরবতা ছিল তাঁর অস্ত্র
যে সময়ে তারকারা গণমাধ্যমে ছবি তুলতে ব্যস্ত থাকতেন, সূচিত্রা সেন ছিলেন একেবারে উল্টো। তিনি বলতেন, ‘আমি শুধু কাজ করতে ভালোবাসি, আর কিছু নয়।’ এই নীরবতা, এই আত্মমগ্নতা তাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছিল। তিনি সংবাদ সম্মেলন করতেন না, সাক্ষাৎকার দিতে চাইতেন না, সেলিব্রেটি লাইফ এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু পর্দায় এলে তিনিই হয়ে উঠতেন এক অদ্বিতীয় শক্তি।

২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সূচিত্রা সেন। কিন্তু তিনি মরে যাননি। তিনি বেঁচে আছেন পাবনার সেই মাটির বুকে, বেঁচে আছেন বাংলাদেশের সিনেমাপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে। আজ তাঁর জন্মদিনে ভিউজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

এই বাংলার মেয়ে, এই বাংলার দেবী—চিরকাল থাকবেন এমন হয়েই।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ