Views Bangladesh Logo

ইঁদুরের উপরে অ্যান্টিক্যান্সার ব্যাকটেরিয়ার সফল কার্যকারিতা

নতুনভাবে সংশ্লেষিত ন্যানোপার্টিকেল এবং উদ্ভিদ-উৎপন্ন নির্দিষ্ট বায়োঅ্যাকটিভ যৌগের সম্ভাব্য অ্যান্টিক্যান্সার কার্যকারিতা ইঁদুরের (mice) ক্যান্সারের সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। তথা ইঁদুরের উপরে অ্যান্টিক্যান্সার ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করে ক্যান্সার রোধের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন রাজশাহী বিশ্বাবিদ্যালয়ের (রাবি) এক দল গবেষক।

সম্প্রতি ভিউজ বাংলাদেশকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছে রাজশাহী বিশ্বাবিদ্যালয়ে (রাবি) গবেষণারত একদল গবেষক। এই দলে রয়েছেন মো. মুনতাছির আহমেদ, উম্মে শায়লা, মো. মহিউদ্দিন, সুস্ময় চন্দ্র দাস, মুবাশ্বিরা আঞ্জুম মাহি ও সাদিয়া নেহা। এই দলের সুপারভিশন করছেন রাবির জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশাদুল ইসলাম।

তারা বিষয়টির শিরোনাম নাম দিয়েছেন ‍‍"ন্যানো-পার্টিকেল ও ভেষজ উপাদানে ক্যান্সারের নতুন চিকিৎসা: রাবি গবেষকদের সাফল্য ও আগামীর সম্ভাবনা"

মুনতাছির আহমেদ বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসায় ন্যানোপার্টিকেল ও প্রাকৃতিক যৌগের সম্ভাবনা: Ehrlich Ascites Carcinoma এর উপর প্রাক-ক্লিনিক্যাল গবেষণা : ক্যান্সার বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অন্যতম প্রধান মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিবেচিত। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং সার্জারি অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও এগুলোর উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, কার্যকর এবং লক্ষ্যনির্ভর (targeted) নতুন থেরাপিউটিক কৌশল উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ন্যানোটেকনোলজি এবং উদ্ভিদ-উৎপন্ন বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ ক্যান্সার চিকিৎসায় সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

উম্মে শায়লা বলেন, এই গবেষণায় আমরা Ehrlich Ascites Carcinoma (EAC) নামক একটি বহুল ব্যবহৃত পরীক্ষামূলক ক্যান্সার মডেল ব্যবহার করছি, যা সাধারণত ইঁদুরে (mice) ক্যান্সারের বৃদ্ধি ও চিকিৎসার কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়। গবেষণাটির মূল লক্ষ্য হলো নতুনভাবে সংশ্লেষিত ন্যানোপার্টিকেল এবং উদ্ভিদ-উৎপন্ন নির্দিষ্ট বায়োঅ্যাকটিভ যৌগের সম্ভাব্য অ্যান্টিক্যান্সার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা।

মহিউদ্দিন বলেন, প্রথম ধাপে একটি নির্বাচিত উদ্ভিদ উৎস থেকে বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ নিষ্কাশন ও বিশ্লেষণ করা হয়। একই সঙ্গে আধুনিক ন্যানোটেকনোলজির মাধ্যমে ধাতব ন্যানোপার্টিকেল সংশ্লেষণ করা হয়, যা ক্যান্সার কোষের উপর লক্ষ্যনির্ভর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। পরবর্তীতে EAC কোষ দ্বারা আক্রান্ত ইঁদুরে এই ন্যানোপার্টিকেল এবং পৃথকভাবে সনাক্তকৃত যৌগ প্রয়োগ করে তাদের অ্যান্টিক্যান্সার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়।

সুস্ময় চন্দ্র দাস বলেন, এই প্রাক-ক্লিনিক্যাল গবেষণায় টিউমারের বৃদ্ধি, কোষের বেঁচে থাকার হার, এবং সম্ভাব্য জিন এক্সপ্রেশন পরিবর্তনের মাধ্যমে চিকিৎসার প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় RT-PCR (Reverse Transcription Polymerase Chain Reaction) প্রযুক্তির মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয় যে, সংশ্লেষিত ন্যানোপার্টিকেল এবং নির্বাচিত প্রাকৃতিক যৌগ এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে ক্যান্সার কোষের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে এর বৃদ্ধি প্রতিরোধে কতটা কার্যকর।

গবেষণাটির ফলাফল ভবিষ্যতে নতুন ও কার্যকর অ্যান্টিক্যান্সার থেরাপি উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ন্যানোটেকনোলজি ও প্রাকৃতিক যৌগের সমন্বিত ব্যবহার ক্যান্সার চিকিৎসায় একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প পথ উন্মোচন করতে পারে।

মুবাশ্বিরা আজুমান মাহি বলেন, অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক যৌগের ভূমিকা: অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বিশেষ করে নিয়মিত অ্যালকোহল গ্রহণ এবং পশ্চিমা ধাঁচের চর্বিযুক্ত খাবার (Western High-Fat Diet) অগ্ন্যাশয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ বা প্যানক্রিয়াটাইটিস সৃষ্টি করে। এই দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহটিই পরবর্তী পর্যায়ে ভয়ংকর প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।

সাদিয়া নেহা বলেন, এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রচলিত কেমোথেরাপির সীমাবদ্ধতা দূর করতে গবেষকরা এখন বিকল্প পথের সন্ধান করছেন। আমাদের গবেষণার অন্যতম মূল দিক হলো—কেমোথেরাপিউটিক ওষুধের সাথে প্রাকৃতিক যৌগ বিশেষ করে রেসভেরাট্রল (Resveratrol)-এর সমন্বিত প্রয়োগ। রেসভেরাট্রল মূলত আঙুরসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে কাজ করতে সক্ষম।

গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কেমোথেরাপি ব্যবহারের চেয়ে রেসভেরাট্রলের সাথে এর সম্মিলিত ব্যবহার প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার কোষ দমনে অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক ফলাফল প্রদান করে। এটি একদিকে যেমন চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে সাধারণ সুস্থ কোষের ওপর কেমোথেরাপির নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি করে।

তাদের দাবি, আমাদের চলমান এই দুই ধরনের ক্যান্সার গবেষণাকে ল্যাবরেটরি থেকে ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে নিয়ে যেতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নির্দিষ্ট বরাদ্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা অনুদান (Research Grant): ল্যাবরেটরি কেমিক্যাল, ন্যানোপার্টিকেল সংশ্লেষণের উপাদান এবং প্রাণী পরীক্ষার (mice model) বিপুল ব্যয় বহনে অনুদান প্রয়োজন।

প্রযুক্তির আধুনিকায়ন: Western Blotting-এর মাধ্যমে প্রোটিন এক্সপ্রেশন বিশ্লেষণ এবং Single-cell RNA sequencing প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকলে গবেষণার গভীরতা ও নির্ভুলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশাদুল ইসলাম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, উন্নত মলিকুলার বায়োলজি ল্যাব এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার সাথে সহযোগিতার সুযোগ পেলে প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা দলগুলো ক্যান্সার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন, ইঁদুরের উপর এই সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। মানুষের উপর পরীক্ষা চালানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও বিশ্ব স্বাস্থা সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন। এই পরীক্ষা সফল হলে বিশ্বাবাসী পাবে ক্যান্সার নিরাময় ব্যবস্থা। একইসাথে, দেশ এক নতুন যুগে পা রাখবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ