আমার ছেলেরে কেউ আগুন লাগাইয়া মাইরা ফেলছে: চঞ্চল ভৌমিকের মা
নরসিংদীতে একটি গ্যারেজ থেকে তরুণের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধারকে ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত তরুণের নাম চঞ্চল ভৌমিক (২৫)। স্বজন ও সহকর্মীদের দাবি, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়। চঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
গত শনিবার ভোরে নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের একটি গ্যারেজে ঘুমন্ত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে চঞ্চল ভৌমিকের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
নিহতের পরিবার জানায়, চঞ্চল ওই গ্যারেজেই কাজ করতেন এবং সেখানেই রাতে ঘুমাতেন। আগুন লাগার বিষয়টি সন্দেহজনক বলে দাবি তাদের।
চঞ্চলের মা ববিতা ভৌমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেরে কেউ আগুন লাগাইয়া মাইরা ফেলছে। তার তো কোনো শত্রু আছিল না। ছয় মাস আগে তার বাবা মারা গেছে, ছোট ছেলেডাও এহন মারা গেল। বড় ছেলে প্রতিবন্ধী, কোনো কাম করতে পারে না। এহন কে সংসার চালাইব?’
চঞ্চল ভৌমিক কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের খোকন ভৌমিকের ছেলে। ছয় মাস আগে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই চঞ্চল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। গ্রামের বাড়িতে মা ববিতা ভৌমিক ও প্রতিবন্ধী বড় ভাই উজ্জ্বল ভৌমিক আছেন।
চঞ্চল সাত বছর ধরে নরসিংদীর দগরিয়া এলাকার রুবেল মিয়ার গ্যারেজে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। এখানে তিনি রাতের বেলায় ঘুমাতেন। স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার ভোরের আগমুহূর্তে গ্যারেজে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে গেলে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিয়ন্ত্রণ আনে, কিন্তু এর আগেই চঞ্চলের শরীর আগুনে পুড়ে যায়। পরদিন সকালে পুলিশ তার পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করে।
গ্যারেজে চঞ্চলের সহকর্মী শান্ত দেবনাথ (২২) বলেন, চঞ্চলের কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল বলে আমি কখনো শুনিনি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, এক অজ্ঞাত ব্যক্তি আশপাশ থেকে মবিলমাখা কাপড় ও কাগজ জড়ো করে গ্যারেজের শাটারের সামনে আগুন ধরান। পুরো গ্যারেজই মবিলে মাখামাখি ছিল, তাই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘুমন্ত চঞ্চলের শরীরে লাগে।
গ্যারেজের মালিক রুবেল মিয়া বলেন, আমি কোনোভাবেই এটিকে দুর্ঘটনা মনে করতে পারছি না। পরিকল্পিত না হলেও এটি হত্যাকাণ্ড। ওই পরিবারে উপার্জন করার আর কেউ নেই।
চঞ্চলের মরদেহ শনিবার সন্ধ্যায়ই কুমিল্লার বাড়িতে পৌঁছে। রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে স্থানীয় শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে তিনটি টিনশেড দোকান রয়েছে। মাঝেরটি রুবেলের গ্যারেজ, বাকি দুটি দোকানেই গাড়ি রং করা হয় এবং যন্ত্রাংশ বিক্রি করা হয়। আগুনের সময় পাশের দুটি দোকানে কোনো ক্ষতির চিহ্ন ছিল না। এ কারণে তারা এটিকে নিছক দুর্ঘটনা মনে করছেন না।
নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ আর আল মামুন জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিকে এখনও শনাক্ত বা আটক করা যায়নি। তাকে ধরতে থানার সঙ্গে র্যাব ও ডিবি যৌথভাবে কাজ করছে। ঘটনার তদন্ত চলমান।
হত্যাকাণ্ডের শিকার চঞ্চল ভৌমিকের পরিবার এখন নিঃস্ব-প্রায়। মা ববিতা, প্রতিবন্ধী বড় ভাই ও ছোট বোন ছাড়া আর কেউ নেই, যারা পরিবার চালাতে পারবেন। স্থানীয়রা বলেন, চঞ্চল ছিলেন পরিশ্রমী, শান্ত, দায়িত্বশীল, কোনো শত্রু ছিল না। তাই ‘হত্যাকাণ্ডের ছায়া’ এ ঘটনার চারপাশে অদৃশ্যভাবে ঝুলছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি গ্যারেজের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করেছিলেন। ঘটনাস্থলে আগুন লাগানোর আগে তিনি ময়লা মবিলমাখা কাপড় ও কাগজ জড়ো করেছেন। এসব প্রমাণ স্থানীয়দের ধারণাকে আরও দৃঢ় করেছে যে, চঞ্চলের মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে