ডিসেম্বরে তৃতীয় টার্মিনালের পরীক্ষামূলক উদ্বোধন, পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম মার্চ-এপ্রিলে: প্রতিমন্ত্রী
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরীক্ষামূলক উদ্বোধন আগামী ডিসেম্বরে হতে পারে। আর আগামী বছরের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে টার্মিনালটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়াও শুরু করা সম্ভব হবে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের বিমান চলাচল’ শীর্ষক সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, বিমান চলাচল খাতের উন্নয়নে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেবে। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দেশের বিমান চলাচল খাতকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব বাংলাদেশকেই নিতে হবে। বিদেশিরা এসে এ খাত গড়ে দেবে না, তবে আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সহযোগিতা করতে পারে।
তিনি বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে দেশে গণতন্ত্র না থাকায় অন্যান্য খাতের মতো বিমান চলাচল খাতেও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও উপযুক্ত নীতিপরিবেশ তৈরি হয়নি। তবে আগামী পাঁচ বছরে বিমান চলাচল খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, জাতীয় বিমান সংস্থাকে শক্তিশালী করা এবং বিশ্বমানের ভূমি সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেই নেতৃত্ব দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে উড়োজাহাজের বহর সম্প্রসারণ, নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট চালু এবং বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বোয়িং নাকি এয়ারবাস—কোন ধরনের উড়োজাহাজ কেনা হবে, সেই সিদ্ধান্তও বাংলাদেশকেই নিতে হবে বলে জানান তিনি।
তৃতীয় টার্মিনালকে দেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই টার্মিনাল নিয়ে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একটি আলোচনা কমিটি গঠন করে জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুত আলোচনা শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই আলোচনা এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে আলোচনার পর বাংলাদেশের জন্য একটি ‘উভয় পক্ষের লাভজনক’ চুক্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে আগের সরকারের রেখে যাওয়া ব্যবস্থার তুলনায় বাংলাদেশের রাজস্বের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হবে।
তবে শুধু টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ করলেই এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নিশ্চিত হবে না বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন প্রস্তুতি, বিমানবন্দর স্থানান্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমও একই মানে প্রস্তুত করতে হবে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রীর বাংলাদেশ হয়ে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে বড় ধরনের আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও বড় ধরনের কারিগরি সংস্কারের সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। নতুন প্রজন্মের পাইলট, উড়োজাহাজ প্রকৌশলী ও ভূমি সেবা কর্মী তৈরির জন্য দেশীয় প্রশিক্ষণকেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এসব প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে, যাতে বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত বিশ্বমানের সেবা দিতে পারে।
বাংলাদেশ যতটা সম্ভব উন্মুক্ত আকাশনীতি অনুসরণ করবে বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ পরিস্থিতিতে আকাশপথ বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে, তবে সেটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে চায় সরকার।
দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বাজারে নতুন রুট ও প্রবেশদ্বার তৈরির সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। চীন, জাপান ও কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আকাশ যোগাযোগ বাড়ানো গেলে পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্বল্প ব্যয়ের বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে বলে জানান তিনি।
বিমান চলাচল খাতের উন্নয়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর আশ্বাস দিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, বেসরকারি খাতে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে সরকার সম্মিলিতভাবে কাজ করবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন খাতে দেশের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করবে।
সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন। সম্মেলনে বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা ও অংশীজনেরা অংশ নেন। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস সম্মেলনের স্বর্ণপৃষ্ঠপোষক ছিল।
মতামত দিন