Views Bangladesh Logo

চকরিয়া-মাতামুহুরী-পেকুয়া প্লাবিত, দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি

কক্সবাজারের চকরিয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে চার দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দুই উপজেলার দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে নদীর পানি। এছাড়া অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

নিহতরা হলেন, বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়া কাটা গ্রামের মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে ও বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুমি আক্তার (১৫) এবং আবদুল মজিদের ছেলে ও স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। সম্পর্কে তারা আপন চাচাতো-জেঠাতো ভাই-বোন ছিল।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে পাহাড়ধসের ঘটনায় লোকজনের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত দুইদিন ধরে গ্রামের পর গ্রাম পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এই অবস্থায় পাহাড়ধসে দুই শিশুর অকালমৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, বমু বিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিংগা, হারবাং এবং নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর, সাহারবিল ইউনিয়নের নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এদিকে পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং পৌরসভা এলাকাও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অনেক ফসলি জমি ও চিংড়ির ঘের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।

টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় দুই উপজেলার পাহাড়ি এলাকার পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করছে প্রশাসন।

চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মঈনুল আমিন বলেন, চার দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামলেই মনে হয় পানি নামবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। রাস্তাঘাট পানির নিচে থাকায় চলাচল খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের কৃষক সৈয়দ আলম বলেন, আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে, ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে।

চকরিয়া পৌরসভার রিকশাচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির কারণে যাত্রী কম, সারাদিন রিকশা চালিয়েও ঠিকমতো আয় হচ্ছে না, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

চকরিয়া পৌরসভার ৩নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঈনউদ্দিন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে, কেউ রান্নাবান্না করতে পারছে না, শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে।

মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজ জানান, চার দিনের টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। ইতোমধ্যে কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়ে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করছে।

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীদ দেলোয়ার বলেন, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীতে পানি বেড়ে গেছে এবং ইতোমধ্যে তা লোকালয়ে প্রবেশ করছে। স্ব স্ব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সজাগ দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে এবং উজানের পানি দ্রুত ভাটির দিকে নামাতে উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর পানি নিষ্কাশনের স্লুইস গেটের কপাট খুলে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, মাতামুহুরী নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপৎসীমা ১১.৮০ মিটার অতিক্রম করে ১১.৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ