এই প্রথম এত কাছ থেকে সূর্যপৃষ্ঠের ছবি, দেখা গেল নতুন ধরনের ঘূর্ণাবর্ত
বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করে সূর্যের পৃষ্ঠের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কাছ থেকে এবং সর্বোচ্চ বিস্তারিত ছবি ধারণ করেছেন। নতুন ছবি ও ভিডিওতে সূর্যের পৃষ্ঠে এমন কিছু ক্ষুদ্র ঘূর্ণাবর্ত (ভর্টেক্স) ধরা পড়েছে, যা আগে কখনো এত স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘূর্ণাবর্তগুলো সৃষ্টি হয় সূর্যের অতিউত্তপ্ত গ্যাসের প্রবাহ এবং শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে। গরম গ্যাসের অবিরাম চলাচলে সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্র পাক খায় ও পরিবর্তিত হয়। এই প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে বিপুল শক্তির বিস্ফোরণ ঘটানোর অন্যতম কারণ, যা মহাকাশ আবহাওয়া সৃষ্টি করে।
মহাকাশ আবহাওয়া পৃথিবীর বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃত্রিম উপগ্রহ এবং মহাকাশচারীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরি (এনএসও)–এর বিজ্ঞানী ড. ডেভিড ববোল্টজ বলেন, সূর্যই সব ধরনের মহাকাশ আবহাওয়ার উৎস। তাঁর মতে, সূর্যের ক্ষুদ্রতম স্তরের পদার্থবিজ্ঞান বোঝা গেলে ভবিষ্যতে মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নির্ভুলভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।
এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ। গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে হাওয়াইয়ের পাহাড়চূড়ায় স্থাপিত ড্যানিয়েল কে. ইনোয়ে সোলার টেলিস্কোপ, যা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীক্ষণযন্ত্র।
গবেষণায় সূর্যের পৃষ্ঠে ‘কেলভিন-হেলমহোল্টজ অস্থিতিশীলতা’ নামে পরিচিত একটি ভৌত প্রক্রিয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি ঘটে যখন পাশাপাশি থাকা দুটি গ্যাস বা তরলের স্তর ভিন্ন গতিতে প্রবাহিত হয়। এর ফলে ছোট ছোট অস্থিরতা তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে পাক খাওয়া ঘূর্ণাবর্তে রূপ নেয়।
একই ধরনের প্রক্রিয়া পৃথিবীর সমুদ্রেও দেখা যায়, যেখানে ছোট ঢেউ ধীরে ধীরে বড় ও শক্তিশালী ঢেউয়ে পরিণত হয়।
এনএসও-এর বিজ্ঞানী ড. ফ্রিডরিখ ভোয়েগারের মতে, এই পর্যবেক্ষণ শুধু মহাকাশ আবহাওয়ার উৎপত্তিই ব্যাখ্যা করছে না, বরং সূর্যের বাইরের স্তর এত বেশি উত্তপ্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিচ্ছে।
গবেষকদের মতে, সূর্যের ওপরের স্তরে যখন পর্যাপ্ত শক্তি জমা হয়, তখন তা হঠাৎ মুক্তি পেয়ে সৌর শিখা বা করোনাল মাস ইজেকশন সৃষ্টি করতে পারে। এসব ঘটনাই পৃথিবীতে জিওম্যাগনেটিক ঝড়ের মতো প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
বিজ্ঞানীদের আশা, সূর্যের এ ধরনের উচ্চ-রেজল্যুশনের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও উন্নত করবে এবং পৃথিবীর প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও মহাকাশ অভিযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মতামত দিন