Views Bangladesh Logo

পিটিয়ে পুলিশ হত্যা: হামলাকারীরা মাদকাসক্ত, পুলিশ পরিচয় পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়

ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাব হোসেনকে হত্যা করা করা হয় অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে। র‍্যাব জানায় ওই সময় যারা হামলা করেছিল, তারা মাদকাসক্ত ছিল।

সোমবার ঢাকার কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন র‍্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে কোনো টার্গেট ছিলেন না। কারণ, আলতাব হোসেন এসবিতে চাকরি করেন বা করতেন এবং তিনি সেই সময় সিভিল পোশাকে ছিলেন।’ একজন বৃদ্ধ মানুষকে যখন আঘাত করা হচ্ছিল, তখন পুলিশ সদস্য ও নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব মনে করে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করেন আলতাব হোসেন। ঘটনাটি ‘নিতান্তই বিচ্ছিন্ন’ বলে মন্তব্য করেন এই র‍্যাব কর্মকর্তা।

গত শনিবার রাতে আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় একটি গেঞ্জি কারখানায় ঢুকে এসআই আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামকে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আলতাব হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর ছেলে এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ ঘটনায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী শিউলি বেগম বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। পরে হামলার ‘মূল হোতা’ প্রাইভেট কারচালক জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেয় পুলিশ।

র‍্যাব জানায়, রোববার রাতে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে র‍্যাব-১০ চারজন এবং আমিনবাজার থেকে র‍্যাব-৪ আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে। মুন্সিগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আলাউদ্দিন, আপন, জিহাদ ও ইমরান। আমিনবাজার থেকে গ্রেপ্তার হন নূর মোহাম্মদ রুদ্র, রাকিব মিয়া, ছাব্বির আহম্মেদ ও ওয়াসিম।

র‍্যাব-১০-এর অধিনায়ক বলেন, ‘চারজনকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হই এবং বিভিন্নভাবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের প্রাথমিক সম্পৃক্ততা আমরা পেয়েছি।’ এ নিয়ে এজাহারভুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে মোট ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

যেভাবে হামলা
র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে একটি অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে গ্যারেজের মালিককে মারধর করা হচ্ছিল। এ সময় প্রতিবাদ করেন এসআই আলতাব হোসেন। প্রাইভেট কারে থাকা পাঁচজন গ্যারেজমালিকের ওপর হামলা করলে ঘটনার সূত্রপাত হয়।

এ সময় গ্যারেজমালিককে মারধরকারীদের সঙ্গে আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুলের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আলতাব হোসেন নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। এতে হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

প্রাণ বাঁচাতে আলতাব হোসেন দৌড়ে তাঁর ছেলের পোশাক কারখানার ভেতরে আশ্রয় নেন, কিন্তু হামলাকারীরা সেখানেও পৌঁছে যায়। পরে আরও ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগীকে ডেকে এনে কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকে তারা। দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দিয়ে আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুলকে মারধর করা হয়, ভাঙচুর করা হয় কারখানার মেশিন ও আসবাবও।

‘কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত’
র‍্যাব কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আপন ও জিহাদ অত্যন্ত অপরাধপ্রবণ এবং বেশ কিছুদিন ধরে তাঁদের পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড খারাপ। তাঁরা ওই অঞ্চলের কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দেন এবং মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হামলাকারীদের বেশির ভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে জড়িত বলে নিশ্চিত হয়েছেন তাঁরা।

র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, আলতাব হোসেনের ওপর প্রথম আঘাত করেন আলাউদ্দিন। জিহাদ চাকু দিয়ে তাঁকে জখম করেন। ওই এলাকার গ্যাংয়ের মূল হোতা বলা হচ্ছে আপনকে, যাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মাদক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে; তিনি এসএস পাইপ দিয়ে আলতাব হোসেনের মাথায় আঘাত করেন। গণপিটুনিতে অংশ নেন ইমরানও।

রিমান্ড চেয়ে আবেদন
আলতাব হোসেন হত্যা মামলার প্রধান আসামি জহুরুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আজ দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জহুরুলের জন্য ১০ দিনের এবং অন্য আসামিদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে, পাশাপাশি নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে জহিরুল ইসলাম তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে বড়দেশী এলাকার মদিনা হাউজিংয়ে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন মজিবর, কাশেম, আলমগীর ও মাসুদ। হাউজিংয়ের ভেতরে একটি অটোগ্যারেজের সামনে পৌঁছালে দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে তাঁদের গাড়ি আটকে যায়। এ নিয়ে গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে জহিরুল ইসলামের তর্কবিতর্ক হয়, একপর্যায়ে তিনি আজাদকে চড়-থাপ্পড় মারেন। প্রতিবাদ করেন তখন পাশের মসজিদে নামাজ পড়ে বাসায় ফেরার পথে থাকা আলতাব হোসেন।
মদিনা হাউজিং এলাকাটি স্থানীয়দের কাছে ‘বালুর মাঠ’ নামে পরিচিত।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, এই এলাকায় ২০ থেকে ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল নিয়মিত আড্ডা দেয় এবং সেখান থেকেই মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও বখাটেপনার মতো অপকর্ম পরিচালনা করে। স্থানীয় আমিনবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য শামসুল হকের দুই ছেলে আপন ও জিহাদ এই দলের নেতৃত্ব দেন এবং জহিরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আপন ও জিহাদের মা জাহি বেগম একাধিকবার মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামের মা রুকি বেগমের বিরুদ্ধেও অন্তত ১৮টি মাদকের মামলা রয়েছে। যদিও জহিরুল দাবি করেছেন তিনি মায়ের সঙ্গে থাকেন না এবং পাশের এলাকায় থেকে রেন্ট-এ-কারের ব্যবসা করেন। গ্রেপ্তার বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে এবং তিনি পুলিশি হেফাজতে মাদক কারবারে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ