সাদ্দামের ঘটনা অমানবিক, সরকার দায় এড়াতে পারে না: ৩৯ বিশিষ্টজনের বিবৃতি
স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুর পর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকা জুয়েল হাসান সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে মৃত স্ত্রী ও সন্তানকে জেলগেটে নিয়ে দেখানোর ঘটনাকে অমানবিক ও নিষ্ঠুর বলে মন্তব্য করেছেন ৩৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক। এই ঘটনায় দায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার নামে এ ধরনের অবহেলা ও প্রতিহিংসামূলক আচরণের দায় অন্তর্বর্তী সরকার এড়াতে পারে না বলেও উল্লেখ করেছেন তারা।
সোমবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকেরা এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর আগে সোমবারই জুয়েল হাসান সাদ্দামকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। তার জামিন আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, জুয়েল হাসান কোনো ফাঁসির আসামি নন এবং নিকট আত্মীয়ের মৃত্যুতে শেষকৃত্যে অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি আইনস্বীকৃত। এ ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বা মামলার প্রকৃতি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। অথচ প্রশাসনের উদাসীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাকে সেই মানবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্ত্রীর মৃত্যুর পর জুয়েল হাসানের পরিবার প্যারোলের আবেদন নিয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় পর্যন্ত ঘুরেছে। কিন্তু সাপ্তাহিক ছুটি ও প্রশাসনিক গড়িমসির অজুহাতে কেউই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এই অমানবিক, অবিবেচক ও নিষ্ঠুর আচরণের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানান বিবৃতিদাতারা।
তারা বলেন, অন্যায় ও বিচারহীনতার অবসানের অঙ্গীকার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও বাস্তবে তা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। জুয়েল হাসানের স্ত্রী ও শিশুপুত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরও তাঁকে শেষকৃত্যে অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া তারই একটি দৃষ্টান্ত।
উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে একাধিক মামলায় বাগেরহাটের সাবেকডাঙ্গা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম প্রায় ১১ মাস ধরে কারাবন্দি ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তাকে বাগেরহাট জেলা কারাগার থেকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণাকে নিজ ঘরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় এবং তাদের ৯ মাস বয়সী শিশুপুত্রকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
বিবৃতিদাতারা হলেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল, নারীপক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সভাপতি জেড আই খান পান্না, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের আইজীবী তবারক হোসেন, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, আইন বিভাগের অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, ফস্টিনা পেরেইরা, মিনহাজুল হক চৌধুরী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, বিএনডব্লিউএলএর নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী, লেখক রেহেনুমা আহমেদ, সাংবাদিক সায়দিয়া গুলরুখ, গবেষক ঈশিতা দস্তিদার, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী পারভেজ হাসেম, কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী, নাগরিক উদ্যেগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান, মানবাধিকারকর্মী সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, আবু আহমেদ ফয়জুল কবির, মাবরুক মোহাম্মদ, আদিবাসী অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা, গবেষক হানা শামস আহমেদ, সিডিএর নির্বাহী পরিচালক শাহ-ই-মবিন জিননাহ।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে