Views Bangladesh Logo

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ফুয়েল লোডিং কী, কীভাবে কাজ করে

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

আজ বাংলাদেশের পারমাণবিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ‘ফুয়েল লোডিং’— অর্থাৎ চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে নিজের নাম লেখাল বাংলাদেশ।

ফুয়েল লোডিং আসলে কী
ফুয়েল লোডিং হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত কারিগরি প্রক্রিয়া। এটি একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জীবনচক্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর একটি— কারণ এই ধাপের মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ খুলে যায়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় ইউরেনিয়ামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পেলেট— যার প্রতিটির ওজন মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম। এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি বিশেষ টিউবের ভেতর সাজিয়ে তৈরি করা হয় ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’। সেই অ্যাসেম্বলিগুলো রিঅ্যাক্টরের ভেতর স্থাপন করার প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং।

কীভাবে চলে এই প্রক্রিয়া
ফুয়েল লোডিং শুরুর আগেই সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে ‘ডামি ফুয়েল’ দিয়ে একটি পূর্ণ মহড়া সম্পন্ন করা হয়েছে। জ্বালানিহীন নকল অ্যাসেম্বলি দিয়ে রিঅ্যাক্টরের সব সিস্টেম, পরিবহন সরঞ্জাম ও লোডিং যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়েছে যে সব কিছু ঠিকঠাকমতো কাজ করছে।

আসল লোডিং প্রক্রিয়ায় রিঅ্যাক্টরের ভেতরের অংশ সম্পূর্ণ পানিতে পূর্ণ রাখা হয়, কারণ পানি তেজস্ক্রিয় বিকিরণ প্রতিরোধ করে। এরপর একটি বিশেষায়িত ও স্বয়ংক্রিয় ফুয়েল লোডিং মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিঅ্যাক্টর কোরের নির্ধারিত স্থানে বসানো হয়। প্রতিটি অ্যাসেম্বলির অবস্থান আগেই নির্ধারিত থাকে — এই ‘কোর কনফিগারেশন’ রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে।

পুরো লোডিং চলাকালে সিস্টেমটি ‘সাব-ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় থাকে — অর্থাৎ কোনো পারমাণবিক বিক্রিয়া তখনও শুরু হয় না। সার্বক্ষণিক নিউট্রন মনিটরিং সিস্টেম চালু রাখা হয়। সব অ্যাসেম্বলি বসানোর পর কন্ট্রোল রড সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তাও আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগে।

সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে আসে সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত— ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এই পর্যায়ে চুল্লিতে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ খুলে যায়। একবার জ্বালানি লোড করলে টানা ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।

নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই
রাশিয়ার রোসাটমের বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সহায়তায় প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি অপারেটর ও ফুয়েল হ্যান্ডলাররা এই কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ প্রতিটি জ্বালানি রডের হিসাব সর্বক্ষণিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে নজরদারি করছে। ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বিশেষ ব্যবস্থায় রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে এবং মাটির ৪০০ মিটার নিচে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হবে।

এরপর কী
ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আগামী আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে বা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট পূর্ণ ক্ষমতায়— অর্থাৎ ১২০০ মেগাওয়াটে— উৎপাদনে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটও চালু হলে কেন্দ্রটি থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে— যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ