Views Bangladesh Logo

রাবিতে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের ছবিসংবলিত বিলবোর্ড, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্যারিস রোডে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত কয়েকজন নেতার ছবিসংবলিত একটি বিলবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারের সংগঠন ‘নভো কালচার’-এর উদ্যোগে বিলবোর্ডটি স্থাপন করা হয়েছে। এটি অপসারণ ও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীরা।

গতকাল শনিবার ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামে বিলবোর্ডটি টাঙানো হয়। এতে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া শাপলা চত্বরের অভিযান, জুলাই আন্দোলন, লগি-বৈঠা তাণ্ডব, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, কোটা আন্দোলন ও আয়নাঘরসহ কয়েকটি বিষয়ও বিলবোর্ডে তুলে ধরা হয়েছে।

আজ রোববার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের সঙ্গে দেখা করে বিলবোর্ডটি অপসারণের দাবি জানান কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী ও শিক্ষার্থীরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মুখপাত্র ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘রাকসু হোক বা নভো কালচার যে-ই এ ধরনের উদ্যোগ নেক না কেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিংবা বাংলাদেশের কোথাও রাজাকারদের কোনো ধরনের স্বাভাবিকীকরণ আমরা মেনে নেব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নটি বাংলাদেশের মৌলিক জাতীয় ইস্যু। ২০২৪ সালের আন্দোলন কিংবা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধী মতাদর্শ বা তাদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই।’ তাঁর ভাষ্য, ‘২০২৪-কে আশ্রয় করে জামায়াত-শিবির তাদের রাজনীতি ও আদর্শকে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, এবং আমরা তার বিরোধিতা করছি।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, ‘দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন, প্রচারপত্র বিতরণ এবং দলীয় কর্মসূচি পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত দুঃখজনক। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে অতীতের অপ্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ইস্যু জুড়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা আমরা দেখি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি কেবল রাজনৈতিক বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করার একটি অপচেষ্টা বলে মনে করি। যুদ্ধাপরাধের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়কে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপনেরও চেষ্টা করা হচ্ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ‘১৯৭১ সালে আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর চিহ্নিত সদস্যদের আমরা ঘৃণাভরে স্মরণ করি। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন বা তাদের ঘিরে বিতর্কিত ন্যারেটিভ তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘নবকালচারের প্রতিষ্ঠাতা রাকসুর সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় এখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও উঠেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’

অন্যদিকে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও নভো কালচারের পরিচালক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, নভোকালচারের বিলবোর্ডে যাদের ছবি রয়েছে, তাদের কয়েকজনকে বাংলাদেশের আদালত যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত করেছেন। এ নিয়ে এর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক হয়েছে। তবে আমাদের বিলবোর্ডের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জুডিশিয়াল কিলিং’।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা এখনো অবগত নই। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি।’

বিলবোর্ডে যাদের ছবি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়। তাদের মধ্যে আব্দুল কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মীর কাসেম আলী ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত অবস্থায় ২০২৩ সালে মারা যান।

উল্লেখ্য, গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে সালাউদ্দিন আম্মার ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর মারধরের শিকার দুই শিক্ষার্থীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় আম্মার ও শিবিরের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘এখতিয়ারবহির্ভূত তৎপরতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগ তুলে উপাচার্য বরাবর লিখিত বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ