Views Bangladesh Logo

জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষে আমার ভাবনা

Mohit  Kamal

মোহিত কামাল

গ্রন্থাগার কোনো নির্দিষ্ট দিনের অনুষঙ্গ নয়; এটি একটি চলমান চর্চা, একটি জীবন্ত অভ্যাস। সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, মানুষের পড়ার ভঙ্গিও বদলে যায়—কিন্তু গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না। সেই গভীরতার ঠিকানাই গ্রন্থাগার। আজকের এই সময়ে, যখন তথ্য হাতের মুঠোয় অথচ মন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, তখন গ্রন্থাগার আমাদের শেখায় থামতে, মনোযোগ দিতে, আর প্রশ্ন করতে। তাই গ্রন্থাগার নিয়ে কথা বলা মানে শুধু বই নিয়ে কথা বলা নয়—মানুষের চিন্তা, মনন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা।

'জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস' ৫ ফেব্রুয়ারি। দিবসটির গুরুত্ব কী? ‘সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলন’ নামের একটা সংগঠন আছে, তাদের উদ্দেশ্য কী? গ্রামে গ্রামে কেন পাঠাগার চাই?


দিবসটি উপলক্ষে আমার কী উপলব্ধি?
'আজকের দিনে গ্রন্থাগার আর শুধু বই রাখার জায়গা নয়; শুধু বইয়ের ঘর নয়। এটি সুস্থির চিন্তার এক নিরাপদ আশ্রয়স্থলও।' গ্রন্থাগার আমাদের নীরবতার শিক্ষা দেয়, ধৈর্য ধরে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে। গ্রন্থাগার মানে দ্রুত স্ক্রল করা নয়, ধীরে ভাবা--রিল-শর্টস-হেডলাইন যুগে এটা খুব প্রাসঙ্গিক।

আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, ডিজিটাল যুগে গ্রন্থাগারের সঙ্গে সংঘর্ষ নয়, সহাবস্থান চাই। অর্থাৎ 'ডিজিটাল মাধ্যম গ্রন্থাগারের শত্রু নয়; বরং গ্রন্থাগারই শেখায় কীভাবে ডিজিটাল জ্ঞান দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হয়।

গুগল তথ্য দেয়, গ্রন্থাগার প্রেক্ষাপট দেয়। অনলাইন পড়া চোখে ইমেজ তৈরি করে, গ্রন্থাগারে পড়া মস্তিষ্কে যায়, মনে ঢোকে।
গ্রন্থাগার দিবসে বিশেষ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।

এ সময়ে মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি এমন প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা তথ্য জানে, কিন্তু গভীরভাবে ভাবতে জানে না? মানুষের মন টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রন্থাগারের সুরক্ষা করতে হবে। এজন্য গ্রন্থাগার টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ আসলে শুধুমাত্র বইয়ের সুরক্ষা নয়, মানুষের মন টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টাও এখানে গুরুত্বের সঙ্গে মিশে আছে। যারা গ্রামে গ্রামে পাঠাগার চালাচ্ছেন, আপনারাই জানেন, বই রাখা যতটা সহজ,পাঠক ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন।

পাঠাগার মানে শুধু আলমারি আর তালা নয়, সারবাঁধা চেয়ার-টেবিল নয়। এটা মানুষের অবসর সময়ের সঙ্গে লড়াই-- অবসরের ঘনিষ্ঠ সহচর। সঙ্গী। মোবাইল, ইউটিউব, টিভির সঙ্গেও নীরব প্রতিযোগিতার মননক্ষেত্র। গ্রন্থাগারে কেউ হাততালি দেয় না, কিন্তু চিন্তা জন্ম নেয়।

লেখক-পাঠাগার সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত? আমরা, লেখকরা, প্রায়ই পাঠক নিয়ে কথা বলি, কিন্তু পাঠাগার নিয়ে কম ভাবি। অথচ পাঠাগারই লেখক ও পাঠকের মাঝের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেতু।

অনেক পাঠাগারে লেখকের বই পৌঁছায় না। পাঠাগারের সঙ্গে লেখকেরও যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। এই বাস্তবতায় দুই পক্ষকে দায়িত্ব নিতে হবে, দায়িত্বশীল হতে হবে।

গ্রামে গ্রামে পাঠাগার গড়ে তোলার ভাবনা কেবল রোমান্টিক বিষয় নয়, জরুরি আর বাস্তব চাহিদারই অংশ। গ্রামের পাঠাগারকে আমরা প্রায়ই আবেগ দিয়ে দেখি, অবহেলার চোখেও। কিন্তু বাস্তবে এটা এক ধরনের সংগ্রাম।

বাস্তব সমস্যা কী?
অর্থের টানাপোড়েন। বই পুরোনো হয়ে যাওয়া। নষ্ট হওয়া কিংবা পোকায় খাওয়া। নতুন নতুন বইয়ের সংগ্রহের ঘাটতি। কিংবা বইয়ের প্রতি তরুণদের আগ্রহ কমে যাওয়া। পাঠকপ্রিয় বই নির্বাচনের সুযোগও কমে যাওয়া। বইয়ের জগতে প্রচলিত 'জনপ্রিয়' শব্দটি সমগ্র জনগোষ্ঠীকে রিপ্রেজেন্ট করে না। বিপুল জনগণের মধ্যে তুলনামূলক ভাবে পাঠকের সংখ্যা খুবই নগণ্য। অথচ একটি লেখকগোষ্ঠী শব্দটা ব্যবহার করেন। তাঁরা জোর করে ভুলে থাকার চেষ্টা করেন যে বিপুল জনগোষ্ঠী কিংবা জনগণ বই পড়ে না। জনগোষ্ঠীর অতি সামান্য সংখ্যকই বই পড়েন। তাঁরাই পাঠক। 'পাঠকপ্রিয়তা' দিয়ে মূল্যায়ন করলে ভালো বইয়ের সন্ধান পাওয়া দুষ্কর নয়। জনপ্রিয়, অজনপ্রিয় শব্দগুলো ব্যবহার করে বইয়ের জগৎকে আমরা সংকুচিত করে ফেলছি। সাহিত্যের মাঠে শব্দগুলো ব্যবহার করে ব্যাপক অপড়ুয়া জনসমুদ্রের মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁক তৈরি করছি, হয় জেনে কিংবা না-জেনে। Conflect of intrest দূর করতে হলে ভালো বই বাছাই এবং যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে 'প্রকৃত পাঠকদের' মধ্য থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক বাছাই কমিটি কিংবা লেখক কর্তৃক বই বাছাইয়ের প্রবণতা ভালো বই আড়ালে রেখে দিতে পারে। আর কোটা সংরক্ষণ করে রাখা তো ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করে দিতে পারে ভবিষ্যতে।

কোনো বই পড়লে অন্তর্গত মোটিভেশনাল ফোর্স ব্যক্তি লেখককে স্বজনপ্রীতিতে ডুবিয়ে দিতে পারে (এই স্বজনপ্রীতি সহজাতভাবে চলে আসতে পারে) কিন্তু সমগ্র মগ্ন পাঠককে স্পর্শ করতে পারে না। যেকোনো কাজে ত্রুটি থাকতেই পারে। তবে সাফল্যের অংশটাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পরবর্তী ধাপে ভুল সংশোধন করে নতুন প্রক্রিয়ায় কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে 'পুরো জনগোষ্ঠী'কে সামনে তুলে ধরে, চোখে অজ্ঞতার ঠুলি পড়ে, 'ক্ষুদ্রতম পাঠকগোষ্ঠী'র চাহিদার তুলনামূলক মূল্যায়ন সঠিক চিত্র তুলে ধরে না।

তবু গ্রামে একটা পাঠাগার থাকা মানে কঠোর সংগ্রামের মধ্যে থাকা, হাল ছেড়ে না-দিয়ে বৃহত্তর প্রজন্মকে বইমুখি করে গড়ে তোলার যুদ্ধে লেগে থাকা। বলা যেতে পারে যে গ্রামে পাঠাগার আছে সে গ্রামটি হাল ছেড়ে দেয়নি। অনলাইনের ঢালাও জোয়ারে ভেসে যায়নি।
তারা আলোর পথের যাত্রী।

গ্রামের পাঠাগার সক্রিয় রাখতে হলে কী করতে হবে?
মাসে একদিন 'নীরব পাঠ দিবস' পালন করা প্রয়োজন। 'ছোট পাঠচক্র' গঠন করলে স্থানীয় লেখকদের মধ্যে কথোপকথনের সুযোগ তৈরি হবে, যোগাযোগ বাড়ে। ভাবের আদান-প্রদান উন্নত হয়, সম্পর্ক শাণিত হয়, সাহিত্যচর্চার প্রতি আগ্রহ অনুপ্রাণিত হয়। আর তাই একথা জোরালোভাবে বলা যায়, গ্রন্থাগার বাঁচাতে বাজেটের আগে আগ্রহী মানুষের অংশগ্রহণ দরকার, জরুরি।

গ্রামে,পাড়া-মহল্লায় যারা শত বাধা পেরিয়ে পাঠাগার চালিয়ে যাচ্ছেন, কেবলই বইয়ের যত্ন নিচ্ছেন না; আপনারা ভবিষ্যতের চিন্তাশীল মানুষও তৈরি করছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে আপনাদের প্রতি আমাদের ঋণটা স্বীকার করতে চাই।

আসুন প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিশেষ দায়িত্ব পালন করি। আমি কী করেছি? করছি? ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে বিটিভিতে বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করেছি পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তুলুন। এক সময় বলতে শুরু করেছি অ্যাপার্টমেন্টে অ্যাপার্টমেন্টে লাইব্রেরি গড়ে তুলুন ।
তারপরের ধাপে বলেছি ঘরে ঘরে লাইব্রেরি গড়ে তুলুন। বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশোতে এই বিশেষ বিষয়ে প্রফেশনাল অভিজ্ঞতার কারণে সোচ্চার ছিলাম।

এখন বলছি, সন্তানের ঘরেই বয়স অনুযায়ী লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করুন। আর এখনকার জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের যে স্লোগান উঠেছে --গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরি গড়ে তোলার, তা সমগ্র দেশকে রিপ্রেজেন্টে করবে বলে বিশ্বাস।
শুভ উদ্যোগ।
সফল হোক।
গুরুত্বের সঙ্গে নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে হবে প্রশাসনিক নিয়ম নীতিমালার মধ্য দিয়ে। চিন্তাশীল জাতি নির্মাণে বিষয়টাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ