কাঁচা চামড়ার বাজারে আবারও ধস, কার্যকর হয়নি সরকারি দর
পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে চলতি বছরও কাঁচা চামড়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সরকারের নির্ধারিত দাম কার্যত উপেক্ষা করেছেন ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা। ফলে মৌসুমী ব্যবসায়ী, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোকে এবারও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। সরকার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চামড়া বিক্রি হয়েছে এর চেয়ে অনেক কম দামে।
শুক্রবার (২৯ মে) মৌসুমী ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় প্রতি চামড়ায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে তাদের। অন্যদিকে ছাগলের চামড়ার চাহিদা ছিল অত্যন্ত কম। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমী সংগ্রহকারীরা মূলত ট্যানারি মালিক ও বড় পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাজারে তাদের নির্ধারিত কম দামে চামড়া কিনতে ও বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজধানীর সবচেয়ে বড় কাঁচা চামড়ার বাজার লালবাগের পোস্তা ঘুরে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে বিপুল পরিমাণ চামড়া বাজারে এলেও ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দাম পাননি। অনেকের অভিযোগ, প্রতি বছর ঈদের আগে সরকার দাম ঘোষণা করলেও কার্যকর বাজার তদারকি না থাকায় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, একটি চামড়া সংরক্ষণে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন খরচসহ প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ব্যয় হয়। অথচ বেশিরভাগ চামড়া বিক্রি হচ্ছে সরকারের প্রত্যাশিত মূল্যের অর্ধেকেরও কম দামে।
পোস্তা বাজারে ২০টি গরুর চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমী ব্যবসায়ী আকমল হোসেন বলেন, তিনি প্রতি চামড়ার দাম ১ হাজার টাকা চাইলেও পাইকাররা ৬৫০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “গত বছর একই ধরনের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার সরকার দাম বাড়ালেও কেউ ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকার বেশি দিতে চায় না।”
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, মগবাজার, মুগদা, ধানমন্ডি, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব ও শেওড়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ছোট গরুর চামড়া ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাঝারি চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং বড় চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকার নির্ধারিত হিসাবে মাঝারি চামড়ার দাম হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় চামড়ার দাম ২ হাজার টাকারও বেশি।
মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা সরকারের নির্ধারিত দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য দিচ্ছেন না। এতে শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোও ক্ষতির মুখে পড়ছে, যারা চামড়া বিক্রির অর্থের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
এদিকে ছাগলের চামড়ার বাজারও ধসে পড়েছে। কোথাও কোথাও মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় চামড়া বিক্রি হয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যেই সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, ছাগলের চামড়া এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বিক্রির অর্থ দিয়ে সংরক্ষণ খরচও উঠছে না।
প্রতি বছর কোরবানির চামড়া সংগ্রহের মাধ্যমে পরিচালিত মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোও চলমান এই বাজার অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ বলছেন, চামড়া বিক্রির আয় এতিমখানা, আবাসিক ব্যবস্থা ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
খিলগাঁওয়ের নাজমুল হক মাদিনাতুল উলুম কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাহবুবুল্লাহ অভিযোগ করেন, চামড়া শিল্পকে প্রতি বছর “পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস” করা হচ্ছে। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও বড় আর্থিক সংকটে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে