রংপুরের চার খুনের ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে: আসক
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যায় একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংগঠনটি বলছে, ঘটনার সময়, মোবাইল ফোনের তথ্য, হত্যার কারণ এবং আলামত নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট আসকের দুই সদস্যের একটি দল রংপুরে গিয়ে নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী, অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্য, পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে। তারা মর্গ ও হাসপাতালের কর্মী এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন। বৃহস্পতিবার সংগঠনটি তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে।
আসক জানায়, নিহত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী তাদের বলেছেন, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার সঙ্গে বোনের সর্বশেষ কথা হয়। কিন্তু পরদিন মোবাইল ফোনে তিনি দেখতে পান, রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার নম্বর থেকে তার কাছে একটি ফোন করা হয়েছিল। তিনি সেই ফোন ধরতে পারেননি। পূজার ভাষ্য, প্রীতিলতা সাধারণত এত রাতে ফোন করতেন না। ফলে ওই ফোনকলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও সন্দেহজনক বলে মনে করছে আসক।
সংগঠনটির মতে, রাত ২টা ৪০ মিনিটের ওই ফোনকলের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময়ের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কে ফোনটি করেছিলেন, কতক্ষণ কথা হয়েছিল, ওই সময় মোবাইল ফোনটি কোথায় ছিল এবং পরিবারের সদস্যদের ফোন কখন বন্ধ হয়েছিল—এসব জানতে কল বিবরণী, মোবাইলের অবস্থান ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করা জরুরি।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ভোরে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধা দাস গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। গণপতি তাদের বাধা দিলে কথা-কাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ঘটনাটিকে ডাকাতির মতো দেখাতে ঘর তছনছ করা হয়েছিল বলেও পুলিশ জানিয়েছিল।
তবে বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে বিদায়ী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ হত্যার সম্ভাব্য কারণের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি গণপতির পরিবারের সঙ্গে জমি নিয়ে সিদ্ধার্থের অসন্তোষও হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে। সিদ্ধার্থের জবানবন্দির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, গণপতির পরিবারের কাছে সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের জমি বিক্রি করা হয়েছিল। তুলনামূলক বেশি দামে জমি বিক্রি হলেও সিদ্ধার্থের পরিবারের অন্য অংশীদাররা তাদের পাওনা পাননি বলে দাবি করা হয়েছে।
শিশু আয়ুষকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছিল—পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের বিষয়টিও পরে বদলে যায়। আসকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পরে আদালতে দেওয়া বক্তব্যে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাবি করেন, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখে ফেলেছিল।
আসক জানায়, ২২ আগস্ট রাত ৮টার কিছু পর পূজা তার বোনের নম্বরে ফোন করে সেটি বন্ধ পান। পরিবারের অন্য সদস্যদের ফোনও বন্ধ থাকায় তিনি রাত সোয়া ৯টার দিকে স্বামীকে নিয়ে ওই বাড়িতে যান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
পূজার বর্ণনা অনুযায়ী, গণপতির মরদেহ ছিল ছাদে, প্রীতিলতা ও আগামীর মরদেহ সিঁড়িতে এবং আয়ুষের মরদেহ একটি কক্ষের কোণে। পুরো বাড়ি তছনছ অবস্থায় ছিল।
আসক বলছে, হত্যার পর অভিযুক্তরা যদি বাড়িতে অবস্থান করে থাকেন, তাহলে সেখানে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, চামড়ার কোষ, চুলসহ বিভিন্ন ধরনের ফরেনসিক আলামত থাকার কথা। বাড়ির বিভিন্ন স্থান, শৌচাগার, পানির উৎস, খাবারের বাসন, দরজা-জানালা ও আসবাব থেকে এসব আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
ময়নাতদন্তের বিষয়েও আসক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে। সংগঠনটির সদস্যরা মর্গের দায়িত্বে থাকা সাহেব আলী ও ডোম যতন কুমারের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহগুলো পচনধরা অবস্থায় ছিল। ধারালো অস্ত্রের আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন তারা দেখতে পাননি, যদিও শরীরের কিছু অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল। দুই নারী নিহতের শরীরে যৌন নির্যাতনের কোনো চিহ্নও তারা দেখেননি বলে জানান। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
আসক স্পষ্ট করে বলেছে, মর্গকর্মীদের পর্যবেক্ষণ চূড়ান্ত চিকিৎসা মতামত নয়। ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হবে।
এদিকে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ছেলের গ্রেপ্তার ও পুরো ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। মুগ্ধার মা সেনা রানী দাসও তার ছেলে হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আরেক অভিযুক্ত সীমান্ত চন্দ্র দাসের বাবা-মা দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে সীমান্ত বাড়িতেই ছিলেন। সিদ্ধার্থ কিছু সময় তাদের বাড়িতে এলেও রাতে সেখানে থাকেননি বলেও তারা জানান।
আসকের মতে, এসব বক্তব্যও অন্যান্য তথ্য ও প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংগঠনটি বলেছে, এ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার মোবাইল ফোন থেকে কে ফোন করেছিলেন এবং সেই সময় ওই পরিবারের ভেতরে আসলে কী ঘটছিল। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ডিজিটাল ফরেনসিক, কল বিবরণী, মোবাইলের অবস্থান, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএসহ সব ধরনের আলামত সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
মতামত দিন