রংপুরে ৪ হত্যা: আসামি ও পুলিশ কর্মকর্তার গায়ের একই ধরনের শার্ট নিয়ে প্রশ্ন
রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের হাতে আটক দুই ব্যক্তিকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা-প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে আটককৃতদের একজনের গায়ের জামা এবং রংপুরের একজন পুলিশ কর্মকর্তার গায়ের জামা একই ধরনের—এমন ছবি অনেকে শেয়ার করে প্রশ্ন তুলেছেন, পুলিশের জামার মতো জামা ওই ব্যক্তির গায়ে গেল কী করে।
আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এটি কাকতালীয়। আড়ং ব্র্যান্ডের ওই জামা রংপুরে আমিসহ আরও দুইশো জনের আছে। একই ধরনের শার্ট আরও অনেকেরই থাকতে পারে। এটিকে সামনে এনে ঘটনা ভিন্নভাবে প্রচারের চেষ্টা চলছে।’ ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সময় সনাতন চক্রবর্তী ওই জামাটিই পরিহিত ছিলেন এবং স্থানীয় কিছু নিউজ পোর্টালের লাইভ সম্প্রচারেও তাকে সেই শার্টে দেখা গেছে বলে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক জানিয়েছেন। পরে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে যখন বাইরে আনা হয়, তখন সিদ্ধার্থ দাসের গায়েও একই ধরনের শার্ট দেখা যায়। সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা যখন তাদের আটক করে আমাদের অফিসে এনে বসাই, তখনও সিদ্ধার্থ দাসের গায়ে ওই শার্টটিই ছিল।’ তবে সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে যে, এ ধরনের শার্ট সিদ্ধার্থ দাসকে তারা আগে পরতে দেখেননি।
সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার আরেকটি দিক হলো, নিহত ও আটক ব্যক্তিরা একই ধর্মাবলম্বী হওয়া নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, যদিও এ ধরনের প্রশ্নের সমর্থনে তদন্তসংশ্লিষ্ট কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
উল্লেখ্য, গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দোতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন গণপতি চক্রবর্তী; মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে পুরো বাড়িতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখান থেকে একে একে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রোববার সংবাদ সম্মেলন করে রংপুরের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, আটক হওয়া মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই মাদক সেবন করে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গলায় গামছা পেঁচিয়ে একে একে চারজনকে হত্যা করেছেন। পুলিশ আরও জানায়, পাশের বাড়ির ছাদ ব্যবহার করে হত্যাকারীরা গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে উঠেছিল।
গণপতি চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী যে মামলা করেছেন, তাতে অজ্ঞাতনামা আসামিরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, একুশে আগস্ট শুক্রবার রাত আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিট থেকে বাইশে আগস্ট শনিবার পৌনে নয়টার মধ্যে কোনো এক সময় অজ্ঞাতনামা আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছেন। এই মামলা দায়েরের আগেই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। পুলিশ কমিশনার নিজেই সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই দুজন খুনের কথা স্বীকার করে কীভাবে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন।
সনাতন চক্রবর্তী জানান, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আটক দুজনই আরও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরাও সব দিক থেকে তদন্ত করেছি। তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। সব মিলিয়ে ঘটনার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে ও প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা দ্রুত চার্জশিট দিয়ে দেব।’
রোববার গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহের ময়নাতদন্ত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্পন্ন হয়। হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ময়নাতদন্ত করেছি। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছে। শরীর থেকে যেসব নমুনা সংগ্রহ করা যায় তা করেছি। এগুলো এখন সিআইডি ল্যাবে পাঠাব। সেখান থেকে যে রিপোর্ট আসবে তার ভিত্তিতে আমাদের মতামত দেব।’ চোয়াল ভাঙার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চোয়াল ভাঙার কোনো লক্ষণ তারা পাননি, যদিও এর আগে পুলিশ কমিশনার ব্রিফিংয়ে চোয়াল ভাঙার কথা উল্লেখ করেছিলেন। অ্যাসিড ব্যবহার করে মরদেহ বিকৃত করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. বিশ্বাস বলেন, ‘এমন কিছু তারা ময়নাতদন্তে পাননি।’ তার ভাষায়, ‘পচে যাওয়ার কারণে এমন দেখা যাচ্ছে। অ্যাসিড বা এমন কিছু ছিল না।’
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাইয়ের মেয়ের জামাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, রোববার রাতেই নিহতদের সবার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
মতামত দিন