প্রাচ্য থেকে বিউপনিবেশায়নের যুগে শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্ন
গুরু থেকে এআই শিক্ষার এক ধারাবাহিক বিবর্তন সমাজকে এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দ্বার করিয়ে রেখেছে। মানুষ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে, শিক্ষা-শিক্ষকের সম্পর্ক কিভাবে কাজ করে? শিক্ষার সংজ্ঞা কি তথ্যের অবাধ প্রবাহ-স্বশিক্ষা-সুশিক্ষা? নাকি তথ্য মুখস্থের সংকলন আয়ত্তে রাখাই মেধাবীর চূড়ান্ত মাপকাঠি?
তবে ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে শিক্ষা কখনো শুধু তথ্য আদান-প্রদান ছিল না। বরং এটি ছিল একটি অবিচ্ছিন্ন জ্ঞান প্রবাহ, যাকে বলা হয় পরম্পরা। সেখানে শৌনক বিনীতভাবে গুরু অঙ্গিরসের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন: এমন কী জ্ঞান আছে, যা জানতে পারলে এই জগতের সকল কিছু জানা যাবে? এই সংলাপে ভারতীয় শিক্ষার বাহ্যিকরূপ যাত্রা শুরু হয়।
তৈত্তিরীয় উপনিষদের বর্ণনায় এই সম্পর্ক আরো সুন্দর ভাবে ফুটে উঠে। সেখানে সমাবর্তনের সময় গুরু শিষ্যকে উপদেশ দেন: সত্য বলো, ধর্ম আচরণ করো, মাতৃদেব, পিতৃদেব ও আচার্যদেবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও। তবে শ্রদ্ধা এখানে অন্ধ আনুগত্যের বিষয় নয়। শিষ্যকে বিচার করার অধিকার দেওয়া হয়েছে, আর গুরুকে স্বীকার করতে হয়েছে তিনিও নিখুঁত নন। শিক্ষা তাই দুই পক্ষের পারস্পরিক দায়বদ্ধতার সম্পর্ক। এভাবেই মোটামুটি এই প্রাচ্যে জ্ঞানের প্রচারে শিক্ষকের ভূমিকা দেখা যায়।
তবে পাশ্চাত্যে শিক্ষার ক্রমবিকাশ ভিন্ন ধাচের। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের দিকে এথেন্সে শিক্ষার জগতে এক বড় পরিবর্তন ঘটে। গণতন্ত্রের বিকাশের ফলে নাগরিকদের সভায় বক্তৃতা দিতে হতো, আদালতে নিজের মামলা নিজে লড়তে হতো। তাই বাগ্মিতা-যুক্তির কৌশল আয়ত্ত করাই হয়ে উঠে ক্ষমতা-সাফল্যের মানদণ্ড। এই চাহিদা মেটাতে এলেন সোফিস্টরা। প্রোটাগোরাস, গর্জিয়াস, হিপিয়াসরা এক নগর থেকে নগরে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেন, ছাত্র জোটাতেন এবং বিনিময়ে বড় অঙ্কের ফি নিতেন।
এটিকেই জ্ঞানের বাণিজ্যিকীকরণের প্রথম সুসংগঠিত রূপ বলা যায়। জ্ঞান বলতে এখানে 'সেবা', যার একজন ক্রেতা আছে, একজন বিক্রেতা আছে। সেই সাথে বিতর্কে জয়ী হওয়ার অপার সম্ভাবনা।
সমস্যাটা শিক্ষকের পারিশ্রমিক নেওয়া নয়। শিক্ষক অবশ্যই সম্মানজনক জীবিকার অধিকারী। সমস্যা তখনই, যখন জ্ঞানের লক্ষ্য 'সত্য' থেকে সরে গিয়ে কেবল ক্রেতার সন্তুষ্টি বা বাজারের পুঁজিবাদী মানসিকতায় পর্যবসিত হয়।
দুই কুলেই এটা মোটামুটি স্পষ্ট যে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক সুমধুর হয়, শিক্ষাকে অর্থমূল্যে উৎসাহিত করা হয়েছে। শিক্ষকরা তাদের অর্জিত বিদ্যাভান্ডার ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে জগৎ সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত-গ্রগতিশীল-আধুনিক করে তোলেন। কিন্তু শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক ইতিহাসে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটে। ক্ষমতা যখন দু’য়ের মাঝে চলে আসে তখন যে সংঘর্ষ অনিবার্য। তবে সেটা ভীষ্ম আর পরশুরামের মতো জ্ঞানের পরিশুদ্ধতা নিয়ে নয়। অহংকার-লোভ-হিংসায়-কামের সংঘর্ষ।
মহাভারতে দ্রোণাচার্য নিষাদপুত্র একলব্যকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। একলব্য দূর থেকে নিজের চেষ্টায় দ্রোণের মূর্তি বানিয়ে ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী হন। দ্রোণ তা জানার পরে, গুরুদক্ষিণা হিসেবে তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুল চেয়ে নিলেন। দ্রোণের উদ্দেশ্য ছিলো অর্জুনকে শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর বানানো। এখানে গুরু শিক্ষার অধিকার বণ্টনে বর্ণ-ক্ষমতার রক্ষক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যখন ক্ষমতা আর অহংকারের দ্বন্দ্ব ব্যাক্তি থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। তখন প্রতিষ্ঠানও আক্রান্ত হয়ে পড়ে।আধুনিক এশিয়ায় এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণগুলোর একটি চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এ সময় শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের "প্রতিবিপ্লবী" আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়, শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়, অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও শিক্ষকদের ওপর বড় আঘাত আসে ১৯৭১ এ। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও অন্যান্য আবাসিক এলাকা সহ দেশজুড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ১৪ ডিসেম্বরে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক-চিকিৎসক-বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ করে হত্যা করে। উদ্দেশ্য ছিল নতুন রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে দেওয়া।
একাত্তরের পরে এর নব্য-ভিন্ন যাত্রা হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে। সরকার পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর চাপ-হুমকি-অপমান-হেনস্তার করা হয়। শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। অপমানে ধকলে মৃত্যুও হয় শিক্ষকদের। যেমনটা হয়েছিল, চট্টগ্রামের হাজেরা-তজু ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ এসএম আইয়ুবের সাথে। তাকে তার প্রতিষ্ঠান থরকর লাঞ্ছিত করে পদত্যাগ করানো হয়ে। তিনি সেইদিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর মারা যান। এসব ঘটনার নেপথ্যে ছিলো রাজনীতি, কোথাও ব্যক্তিগত-প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষোভ।
এটা মর্মান্তিক ঘটনা। শিক্ষকরা তাদের সহকর্মীদের প্রতি ব্যাক্তিগত ক্ষোভকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু গুটিকয়েক শিক্ষকদের ত্রুটির দায়ে পুরো পেশাকে অপমান করা যায় না। আবার একই সঙ্গে এও সত্য, যে রাষ্ট্র শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন-নিরাপত্তা-সামাজিক মর্যাদা দিতে ব্যার্থ, সে রাষ্ট্র কার্যতই রাষ্ট্র হিসেবে ব্যর্থ।
বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অপমান করার শাস্তি কি হতে পারে? রাষ্ট্রের এই আইন তৈরি করার মধ্যে দিয়ে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তার জ্ঞান-বিজ্ঞান ধ্বংসের সম্মুখে দাড়িয়ে আছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিক্ষা একটি পারস্পরিক দায়ের সম্পর্ক। সমাজের দায় শিক্ষককে নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন ও মর্যাদা দেওয়া; যাতে তিনি ভয়-দারিদ্র্য উপেক্ষা করে পড়াতে পারেন। শিক্ষকের দায় জ্ঞানকে নিছক পণ্য না বানিয়ে সত্য ও মানবিকতার সেবায় লাগানো এবং ক্ষমতার তোষামোদ থেকে নিজেকে দূরে রাখা। শিক্ষার্থীর দায় শৌনকের মতো অহংকার ব্যতীত, বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করা।
আবারো ফিরে যাই চীনের দিকে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর চীন দীর্ঘ সময় ধরে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজ্ঞানীদের প্রচারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেখানে বিজ্ঞানীদের জীবনকাহিনি-ছবি ও তাঁদের বক্তব্য প্রচারমাধ্যমে-জনপরিসরে তুলে ধরা হয়।
সামাজিক মনস্তত্ত্বের বিচারে এর শিক্ষণীয় দিক আছে। শিশুরা তাদের মতোই হতে চায়, সমাজ যাদের উদ্যাপন করে। যে শহরের বিলবোর্ড জুড়ে কেবল পণ্যের বিজ্ঞাপন আর রাজনীতিবীদদের মুখ, সেখানে তরুণ-প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবেই ভোগ-ক্ষমতাকে সাফল্যের মাপকাঠি ভাবে। কোনো জাতির আদর্শ কারা, তা অনেকটাই বোঝা যায় তার রাস্তার দেয়ালে কাদের ছবি টাঙানো আছে তা দেখে।
সময়ের সাথে যেমন শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি স্বয়ং শিক্ষকের ভূমিকাও পরিবর্তন হয়েছে। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেকোনো প্রশ্নের উত্তর কয়েক সেকেন্ডে দিতে পারে, প্রবন্ধ লিখতে পারে, অঙ্ক কষে দিতে পারে। তাহলে শিক্ষকের কাজ কী থাকল? কিন্তু কোন প্রশ্নটি করা উচিত, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, যৌক্তিকতা, কীভাবে সত্যের মুখোমুখি হয়ে বাঁচতে হয়, এসব বিচারবোধ ও নৈতিক দিক-নির্দেশনা একজন জীবন্ত মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে। শৌনক যেভাবে প্রশ্ন নিয়ে অঙ্গিরসের কাছে গিয়েছিল, সেই সংলাপের মূল্য কমেনি, বরং বেড়েছে।
মতামত দিন