Views Bangladesh Logo

ঈদে জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক তৎপরতার প্রতিফলন ঘটেছে: মাহদী আমিন

ঈদ ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া গণমুখী উদ্যোগে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ও সুস্পষ্ট নির্দেশনায় এবারের ঈদে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং নীতিগত পরিবর্তন দেখা গেছে। তিনি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সব সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকায় ঈদ উদযাপন করতে বলেছেন, মানুষের পাশে থেকে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে প্রেরণা জুগিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে সরকার প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে সংকটের মধ্যেও স্বস্তি, শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। টানা ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন ও জবাবদিহিহীনতার যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা মুহূর্তেই বদলে ফেলা কোনো জাদুকরী মন্ত্রের পক্ষেও অসম্ভব। তবে এবারের ঈদুল আজহায় দেশের মানুষ অন্তত একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করেছে, তা হলো রাষ্ট্রের আন্তরিক সদিচ্ছা ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক তৎপরতা।

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, এবারের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সরকারের কার্যক্রমে ১০টি গণমুখী বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছিল নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিশ্চিতকরণ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, দেশীয় পশুর বাজার সুরক্ষা, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, গণপরিবহণে শৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট দমন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, চামড়া খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা। এসব উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়ন ঈদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় সেবাকে আরও জনসম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের মাত্র তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। সময়ের পরিমাপে এটি হয়তো খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য প্রতিটি দিনই জনগণের প্রতি অঙ্গীকার রক্ষার দিন, প্রতিটি মুহূর্তই দায়িত্ব পালনের পরীক্ষা, আর প্রতিটি পদক্ষেপই জবাবদিহিতা ও সেবার প্রতিফলন।

মাহদী আমিন বলেন, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, জনকল্যাণ এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই সরকারের প্রতিটি উদ্যোগ, অর্জন এবং চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা চাই জনগণই হোক আমাদের কাজের বিচারক, আর তাদের আস্থা ও সমর্থনই হোক আগামী দিনের পথচলার প্রেরণা।

ঈদ ব্যবস্থাপনায় নেওয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রথমেই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দীর্ঘ ছুটি ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি ছুটি এক সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ও বিশেষ ব্যবস্থাপনা নেওয়ায় মহাসড়কে চাপ কমে আসে এবং অতীতের তুলনায় এবারের ঈদযাত্রায় যানজট নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারপরও যতটুকু হয়েছে, সরকার সচেষ্ট থাকবে আগামীতে সেটারও সমাধানের জন্য।

দ্বিতীয় উদ্যোগ হিসেবে পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্পের শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ব্যাংক, মালিকপক্ষ ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনকে সম্পৃক্ত করে শ্রমিকদের ঈদ আনন্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে মহাসড়ক অবরোধ বা শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি এবং অধিকাংশ কারখানায় সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধ সম্ভব হয়েছে।

তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেশীয় পশুর বাজার ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গবাদিপশু প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং পশুর হাটে সার্বক্ষণিক মনিটরিং চালানো হয়। প্রায় ১ কোটি ১ লাখ পশুর চাহিদার বিপরীতে ১ কোটি ২৩ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু থাকায় দেশে কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তবে তিনি স্বীকার করেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় শেষ সময়ে কিছু প্রান্তিক খামারি প্রত্যাশিত মূল্য পাননি। সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

চতুর্থ উদ্যোগ হিসেবে কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণের বিষয়টি তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন নগর এলাকায় ঈদের দিন থেকেই অতিরিক্ত জনবল ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়। এর ফলে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ এলাকায় বর্জ্য অপসারণ সম্ভব হয়েছে, যা অতীতে কয়েকদিন সময় নিত।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঈদের পরদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে বিভিন্ন সড়কের পরিস্থিতি, অর্থাৎ সরাসরি মাঠপর্যায়ের কাজ পরিদর্শন করেন, যা দেশীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে একটি বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা। পরিদর্শনকালে, ঈদুল আজহার কোরবানির বর্জ্য অপসারণে অবহেলার দায়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একাধিক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

পঞ্চম উদ্যোগ হিসেবে গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ও বিশেষ সুবিধার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে কঠোর নজরদারি ছিল। পাশাপাশি রেল ও মেট্রোরেলে নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোচ চালু এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাড়া ছাড়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। লঞ্চে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় ছাড় এবং ঘাট এলাকায় কুলি ও হকারমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ষষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটবিরোধী অভিযানের কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে পশুর হাটে ইজারাবহির্ভূত চাঁদা আদায় বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়, যার ফলে কৃত্রিম সংকট বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন।

সপ্তম পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে শিল্পকারখানা বন্ধ থাকার সুযোগ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, উৎপাদন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ঈদের দিন ও পরবর্তী সময়ে লোডশেডিং সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

অষ্টম পদক্ষেপ হিসেবে সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জননিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোরবানি-সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামক আলোচিত মহিষটির সংরক্ষণ ও চিড়িয়াখানায় প্রেরণের মাধ্যমে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়িয়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

নবম উদ্যোগ হিসেবে চামড়া শিল্প ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, লবণের জোগান নিশ্চিতকরণ এবং মাঠপর্যায়ে তদারকির মাধ্যমে চামড়া অবিক্রীত থাকা বা নষ্ট হওয়ার হার কমানো সম্ভব হয়েছে। কোথাও কোথাও চামড়া অবিক্রীত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও তা অতীতের তুলনায় অনেক কম বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সবশেষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, চাল, ডাল, তেল, চিনি ও কোরবানি-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার তদারকিতে বিশেষ টাস্কফোর্স কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ থাকা সত্ত্বেও খুচরা বাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

মাহদী আমিন বলেন, ফ্যাসিবাদী ১৬ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও ধ্বংসস্তূপ মাত্র তিন মাসে সম্পূর্ণরূপে দূর করা সম্ভব নয়, এই কঠিন বাস্তবতা দেশবাসী অনুধাবন করে। তবু দীর্ঘদিনের দুঃশাসনে ক্লান্ত জনগণ এবারের ঈদে উপলব্ধি করেছে যে, রাষ্ট্র তাদের প্রতি সংবেদনশীল এবং প্রশাসন কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং জনসেবার কার্যকর ও দায়িত্বশীল মাধ্যম।

তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত প্রথম এই ঈদুল আজহা উদযাপনের ক্ষেত্রে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারের সব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যসহ সর্বমহলে আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা ছিল সর্বোচ্চ, যা নিকট রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। তবু কোথাও কোনো প্রশাসনিক ঘাটতি বা সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হলে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিরসনে সরকার সর্বদা সচেষ্ট ও আন্তরিক।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, এই কর্মযজ্ঞকে পাথেয় করে, গণমানুষের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করা এবং সুশাসনের এই ধারাকে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই হবে বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। জনকল্যাণের সেই আন্তরিক অগ্রযাত্রায় গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্য অনিবার্য, ইনশাআল্লাহ।

এ সময় অন্যদের বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা প্রমুখ।


মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ