বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: ১৯ জনের পথচলা, ২৩তম মির্জা ফখরুল
স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামরিক অভ্যুত্থান, গণআন্দোলন ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের সাক্ষী। এ সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ২২ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত বা দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ, ভারপ্রাপ্ত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির হিসাব ধরলে স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত মোট ১৯ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে কয়েকজন ছিলেন ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৩ বার। রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী হিসেবে সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিরোধী দলগুলো কোনো প্রার্থী দেয়নি। ফলে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবার আবারও রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট অনুষ্ঠিত হলো।
গত ২৪ জুলাই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। বড় ধরনের কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তার পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ২০ আগস্ট দিনব্যাপী ভোট গ্রহণ শেষে ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল অলি আহমদ। চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেন বর্ষীয়ান এই নেতা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে তাকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে আসেন এবং ১২ জানুয়ারি সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু হলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালু হলে তিনি আবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি সপরিবারে নিহত হন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান নেতা। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আরও তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে তাকে হত্যা করা হয়।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯২১ সালের ৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের কালিহাতীর নাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল তিনি দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের নির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। ১৯৮৭ সালের ২ আগস্ট লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
মোহাম্মদউল্লাহ
১৯২১ সালের ২১ অক্টোবর লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদউল্লাহ। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। পরে ১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন এবং ২৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাকের শাসনামলে তাকে উপরাষ্ট্রপতি করা হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরে যান। ১৯৯৯ সালের ১১ নভেম্বর তিনি মারা যান।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ
১৯১৯ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দির দশপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তার রাষ্ট্রপতিত্ব ছিল মাত্র ৮৩ দিনের। ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। ৬ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯৬ সালের ৫ মার্চ তিনি মারা যান।
বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
১৯১৬ সালের ৮ জুলাই রংপুরে জন্মগ্রহণ করেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি সামরিক আইন জারি করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর সেই দায়িত্ব তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ১৯৯৭ সালের ৮ জুলাই তিনি মারা যান।
জিয়াউর রহমান
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টার সময় তিনি নিহত হন।
বিচারপতি আবদুস সাত্তার
১৯০৬ সালের ১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে জন্মগ্রহণ করেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি হন। তবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৮৫ সালের ৫ অক্টোবর তিনি মারা যান।
বিচারপতি আ ফ ম আহসানউদ্দিন চৌধুরী
১৯১৫ সালের ১ জুলাই ময়মনসিংহের গৌরীপুরে জন্মগ্রহণ করেন বিচারপতি আ ফ ম আহসানউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার আমলে রাষ্ট্রের কার্যকর ক্ষমতার বড় অংশ সেনাপ্রধান এরশাদের হাতে ছিল। এরশাদের সঙ্গে মতপার্থক্যের পর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ২০০১ সালের ৩০ আগস্ট তিনি মারা যান।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। আহসানউদ্দিন চৌধুরীর পদত্যাগের পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করে একই বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও গণআন্দোলন ক্রমশ তীব্র হয়।১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণআন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
আবদুর রহমান বিশ্বাস
১৯২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বরিশালের শায়েস্তাবাদে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ৮ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রপতি, যিনি পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের ৮ অক্টোবর তার মেয়াদ শেষ হয়। ২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর তিনি মারা যান।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ
১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
১৯৩০ সালের ১১ অক্টোবর কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর তিনি ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তবে রাজনৈতিক বিরোধ ও নিজ দলের অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে বিএনপি থেকেও পদত্যাগ করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
১৯৩১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জের নয়াগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও নেন। ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অবসর নেন। ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
জিল্লুর রহমান
১৯২৯ সালের ৯ মার্চ কিশোরগঞ্জের ভৈরবে জন্মগ্রহণ করেন জিল্লুর রহমান। ২০০৯ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।
আবদুল হামিদ
১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল হামিদ। জিল্লুর রহমানের অসুস্থতার সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদেও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনার শিবরামপুরে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতির পদে বহাল ছিলেন। তবে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। তার পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। তার এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতির পদে ভারপ্রাপ্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের তালিকায় তার নাম যুক্ত হয়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮০-এর দশকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার কারাবন্দি হওয়া, মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি দলের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
২০ আগস্ট দিনব্যাপী ভোট গ্রহণ শেষে বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল অলি আহমদ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন। একই সঙ্গে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনেরও নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাদের দুই মেয়ে—শামারুহ মির্জা ও সাফারুহ মির্জা।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি পদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তাই শুধু ব্যক্তির পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতারও প্রতিচ্ছবি। ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিষেক সেই দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত করল।
মতামত দিন