রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: আলোচনায় চার নেতার নাম, নজর তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে শেষ মুহূর্তে সরগরম দেশের রাজনীতি। ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন—এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে চার জ্যেষ্ঠ নেতাকে ঘিরে। অন্যদিকে বিএনপির একক প্রার্থিতার সম্ভাবনার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
ফলে দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে কি না, তা নির্ভর করবে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ওপর। তবে রাজনৈতিকভাবে ইতোমধ্যে নির্বাচনটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ হবে।
বিএনপির যেসব নেতা আলোচনায়
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার সঙ্গে আলোচনায় রয়েছেন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খান এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
চারজনের প্রত্যেকেরই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে কে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পাচ্ছেন, সেটিই এখন বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দিয়েছে। ফলে শেষ সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু এখন তারেক রহমান।
সবচেয়ে জোরালো নাম মির্জা ফখরুল
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই আপাতত সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বলে দলীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে দলের নেতৃত্ব ধরে রাখা, নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক মুখ হিসেবে তার ভূমিকা তাকে রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, মার্জিত রাজনৈতিক আচরণ এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কও তার অন্যতম শক্তি। ২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন এবং ২০১৬ সালের কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম আলোচনায় আসার আরেকটি কারণ হিসেবে রাজনৈতিক মহলে বলা হচ্ছে—সরকার পরিচালনার বাইরে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পদে একজন অভিজ্ঞ ও দলের প্রতি আস্থাভাজন ব্যক্তিকে বসানোর প্রয়োজনীয়তা।
এদিকে, দলের প্রবীণ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ নাম। দীর্ঘদিন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা রাজনীতির পাশাপাশি ভূতত্ত্ববিদ, শিক্ষক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের সংকটময় সময়ে নেতৃত্বের সঙ্গে থাকার কারণে বিএনপির ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখা এবং পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ তার রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে বয়স ও শারীরিক পরিস্থিতি তার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে আরেক আলোচিত নাম ড. আবদুল মঈন খান। বিএনপির এই প্রবীণ নেতা রাজনীতির পাশাপাশি একাডেমিক অঙ্গনেও পরিচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বিএনপির বিভিন্ন সময়ে বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তুলনামূলকভাবে সংযত বক্তব্য, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ—এসব কারণে রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে তার নাম বিবেচনায় আসছে বলে আলোচনা রয়েছে।
অন্য তিনজনের পাশাপাশি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের নামের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ তিনি বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
মুক্তিযুদ্ধের বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এই নেতা সামরিক জীবন শেষে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বিএনপির হয়ে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।
এই সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা তাকে অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তুলনায় আলাদা অবস্থানে রেখেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হবে কি না, সেটি নির্ভর করবে বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
১১ দলীয় জোট প্রার্থী করছে অলি আহমদকে
বিএনপির সম্ভাব্য চার নামের বিপরীতে এবার সরাসরি প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। রোববার জোটের বৈঠক শেষে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন।
মুক্তিযুদ্ধের বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত অলি আহমদ দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী। বর্তমানে তিনি এলডিপির চেয়ারম্যান। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন।
ফলে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; বিরোধী জোটের প্রার্থী ঘোষণার কারণে এটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও রূপ নিতে পারে।
দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ বিএনপির
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এক প্রার্থীর জন্যই মনোনয়নপত্র নেওয়া হয়েছে; তবে কোনো ভুলত্রুটি হলে বিকল্প রাখার জন্য দুটি ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে।
অর্থাৎ দুটি ফরম নেওয়া মানেই দুটি প্রার্থী—এমন নয়। বরং একই প্রার্থীর জন্য দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দলীয় সিদ্ধান্তের দায়িত্ব যখন তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছে, তখন শেষ মুহূর্তের আলোচনা মূলত চারজনকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি এখনো কারও নাম ঘোষণা করেনি।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের হিসাবটি অন্য নির্বাচনের মতো নয়। জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন না; সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
বর্তমান সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই স্বাভাবিকভাবে বেশি। ফলে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন—এই প্রশ্নের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি।
একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। আর বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত।
তবে একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণ হলে সেটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হবে। কারণ ১৯৯১ সালের পর অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
নজর এখন তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের দিকে
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন তিনটি প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন, ১১ দলীয় জোটের অলি আহমদ শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকছেন কি না এবং দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সত্যিই ভোটযুদ্ধ হচ্ছে কি না।
বিএনপির চার সম্ভাব্য নামের প্রত্যেকেরই আলাদা শক্তি রয়েছে। মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলনের নেতৃত্ব ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি; খন্দকার মোশাররফের ক্ষেত্রে প্রবীণতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা; মঈন খানের ক্ষেত্রে একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি; আর হাফিজ উদ্দিনের ক্ষেত্রে রয়েছে স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাম্প্রতিক সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা।
এদিকে, দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে গুঞ্জন উঠেছে। তবে এখনো বিএনপি আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি।
শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান কোন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সমীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে একজনকে বেছে নেন সেটাই দেখার অপেক্ষা।
মতামত দিন