১৮ টাকায় উৎপাদিত আলু বিক্রি করতে হচ্ছে ৯ টাকায়, লোকসানে কৃষকরা
গত বছরের মতো এবারও রাজশাহী ও নওগাঁর আলুর বাজারে ধস নেমেছে। উৎপাদন খরচ যেখানে কেজিপ্রতি ১৬ থেকে ১৮ টাকা, সেখানে কৃষকদের আলু বিক্রি করতে হচ্ছে ৫ থেকে ৯ টাকায়। ফলে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা।
রাজশাহীর পবা উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের আলুচাষি মিঠু হাজী চলতি মৌসুমে ১২ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছেন। এক বিঘায় তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা—টেন্ডার, বীজ, জমি চাষ, সার-কীটনাশক, শ্রমিক, সেচ ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে।
প্রতি বিঘায় গড়ে ৫৫ বস্তা (প্রতি বস্তা ৬৫ কেজি) হিসেবে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৫৭৫ কেজি আলু। সেই হিসাবে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ টাকা। অথচ নওহাটা বাজারে পাইকাররা দাম দিচ্ছেন ৮ থেকে ৯ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে লোকসান প্রায় ৯ টাকা।
মিঠু হাজী বলেন, গত বছরও লোকসান গুনেছি। ভেবেছিলাম এবার পরিস্থিতি বদলাবে। কিন্তু আগের চেয়েও খারাপ অবস্থা।
রাজশাহীর পবা, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন হাটে একই চিত্র দেখা গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, শহরের খুচরা বাজারে দাম তুলনামূলক বেশি থাকলেও পাইকারি পর্যায়ে ‘সিন্ডিকেট’ আমদানির অজুহাতে দাম কমিয়ে দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না তারা।
নওগাঁর হাটবাজার ঘুরেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি দাম ৫ থেকে ৭ টাকা। অথচ উৎপাদন খরচ ১৫ টাকার বেশি। ফলে আলু তোলার শ্রমিক খরচ ও পরিবহন ব্যয়ও উঠছে না।
পত্নীতলার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, প্রতি মণ আলু ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে জমি থেকে আলু উঠানোর খরচই ওঠে না।
মান্দা উপজেলার কৃষক ইদ্রিস উদ্দিন বলেন, হিমাগারের ভাড়া দ্বিগুণ। দাম না থাকায় সংরক্ষণ করতেও পারছি না।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩০ টন। গত মৌসুমে ২৫ হাজার ৯৪০ হেক্টরে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ টন। অর্থাৎ এ বছর চাষের জমি কমেছে ৩ হাজার ৯৭০ হেক্টর।
উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে।
টানা লোকসানে অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে আলু চাষ করবেন কিনা তা নিয়ে দ্বিধায়। কেউ কেউ অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
উৎপাদক পর্যায়ে দরপতন আর ভোক্তা পর্যায়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল দাম—এই বৈষম্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কৃষকরাই। তাদের দাবি, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি ছাড়া এই সংকট কাটবে না।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে