না ফেরার দেশে জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়
টলিপাড়ায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় আর নেই। শুটিং করতে গিয়ে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। মাত্র ৪২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন এ অভিনেতা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার ও এইসময় জানিয়েছে, রোববার তালসারি সমুদ্রসৈকতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল। শুটিংয়ের এক পর্যায়ে তিনি পানিতে নামেন। পরে হঠাৎ তলিয়ে গেলে সহকর্মী ও টেকনিশিয়ানরা তাকে উদ্ধার করেন।
তাকে দ্রুত দিঘা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ডুবে যাওয়ার কারণেই মৃত্যু হয়েছে, তবে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ধারাবাহিকটির সহ-অভিনেতা ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, শুটিং শেষে সবাই মধ্যাহ্নভোজে গেলেও রাহুল আরও কয়েকটি দৃশ্য ধারণ করবেন বলে থেকে যান। পরে দীর্ঘ সময় তাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু হলে পানির নিচে পাওয়া যায়।
ঘটনার সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তবে আকস্মিক এই মৃত্যুর ঘটনায় টলিপাড়াজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহকর্মীদের ভাষায়, একজন সুস্থ-সবল মানুষ এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়ায় তারা গভীরভাবে মর্মাহত।
১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর এক নাট্য পরিবারে জন্ম রাহুলের। রক্তেই ছিল অভিনয়। বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের থিয়েটার দল ‘বিজয়গড় আত্মপ্রকাশ’-এর হাত ধরে মাত্র তিন বছর বয়সে ‘রাজদর্শন’ নাটকে প্রথম মঞ্চে পা রাখেন তিনি। এরপর দীর্ঘ কেরিয়ারে প্রায় ৪৫০টিরও বেশি স্টেজ শো করেছেন রাহুল। থিয়েট্রন-এর মতো দলের সঙ্গেও তার নিয়মিত যোগ ছিল। অভিনয়ের প্রতি এই নিখাদ টানই তাকে পরবর্তীকালে পর্দার লড়াইয়ে অক্সিজেন জুগিয়েছিল।
সিনেমায় আসার আগে ছোট পর্দায় নিজের মাটি শক্ত করেছিলেন রাহুল। জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘খেলা’-তে আদিত্যর চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছিল। তবে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০০৮ সালে। রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনি তুমি যে আমার’ ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সরকারের বিপরীতে তার অভিনয় রাতারাতি তাকে সুপারস্টারের তকমা এনে দেয়। ছবির গান থেকে শুরু করে রাহুলের সেই ইনোসেন্ট লুক— আজও দুই বাঙলার নস্টালজিয়া। এই ছবির জন্যই তিনি প্রচুর পুরস্কারে পেয়েছেন তিনি। এরপর জ্যাকপট, ‘লভ সার্কাস’, ‘শোনো মন বলি তোমায়’, ‘পতি পরমেশ্বর’-এর মতো একাধিক ছবিতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। তবে শুধুই সিনেমা নয়, টেলিভিশনের পর্দাতেও রাহুল তাক লাগিয়ে ছিলেন। দেশের মাটি ধারাবাহিকের রাজা চরিত্র এখনও উজ্জ্বল। একের পর এক সিরিজেও অভিনয় করেছেন রাহুল। তার শেষ অভিনীত ছবি অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস এবং রাপ্পা রায় ও ফুলস্টপ ডট কম। এখানেই শেষ নয়, নাটকের মঞ্চে পরিচালক সৌরভ পালোধীর যে জানালা গুলো আকাশ ছিল নাটকে মন জয় করছিলেন রাহুল।
রাজ চক্রবর্তীর চিরদিনই তুমি যে আমার ছবি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই সময়ই সহ অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে পর্দার প্রেম বাস্তবেও পরিণতি পেয়েছিল। সহ-অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রাহুল। তাঁদের কোল আলো করে আসে একমাত্র সন্তান সহজ বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও ২০১৭ সালে তাদের বিচ্ছেদের খবরে মন ভেঙেছিল অনুরাগীদের, তবে ২০২৩ সালে সমস্ত তিক্ততা ভুলে তারা আবার এক হয়েছিলেন। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবং নিজেদের ভালোবাসার টানেই তারা নতুন করে সংসার শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই পুনর্মিলনের আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী যেন হল না।
রাহুলের চলে যাওয়া মানে এক দক্ষ অভিনেতার পাশাপাশি এক নির্ভীক মঞ্চকর্মীর প্রস্থান। আশুতোষ কলেজের প্রাক্তনী এবং নাকতলা হাই স্কুলের এই ছাত্রটি বরাবরই স্পষ্টবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রিয় অভিনেতা হয়তো চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন, কিন্তু তার অভিনীত চরিত্রগুলি বাঙালির হৃদয়ে ‘চিরদিনি’ অম্লান হয়ে থাকবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে