রাজনীতিও ক্রিকেটের মতো অনিশ্চয়তার খেলা
দেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ২৯৮টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। কে কোথায় পেয়েছেন, কে বাদ গিয়েছেন এসব বিষয় সব পত্রিকা ও অনলাইনে প্রকাশ পেয়েছে। সুতরাং সেটা আলোচনার প্রয়োজন নেই। প্রশ্ন হলো, এরপর কী? একদিকে দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে আরেক বড় দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অবরোধ হরতাল চালিয়ে যাচ্ছে।
দেশের তৃতীয় বৃহত রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি নির্বাচনে এসেছে। সেই সঙ্গে আরও কিছু নতুন এবং ছোট দলও নির্বাচনের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে। এর মধ্যে তৃণমূল বিএনপি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নাম উল্লেখ করতে হয়। তৃণমূল বিএনপি গড়ে তুলেছেন বিএনপি থেকে দলছুট তিনজন ভারী রাজনীতিবিদ।
যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে এলে তপশিল পেছানো যেতে পারে; কিন্তু এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে যে বিএনপি নির্বাচনে আসবে না। এ পর্যায়ে দুটি নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। একটি হলো দেশের সাধারণ মানুষের স্রোত নির্বাচনমুখী হয়ে পড়া, আরেকটি হলো নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। সরকার মনে করছে, নির্বাচনে ভোটারের যথেষ্ট উপস্থিতি হলে এবং আপাতদৃষ্টে মোটামুটি স্বচ্ছ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারলে দেশে ও বিদেশে সে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা যাবে। এখন সেটা হবে কি না, তা অনেক ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করছে।
প্রথমত, ক্ষমতাসীন দলের প্রতিটি আসনের জন্য মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন গড়ে ১১ জন। নিঃসন্দেহে এ ১১ জনই দলের সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের কম বেশি সমর্থন দলীয় কর্মীদের মধ্যে আছে। দলটির মনোনয়ন ঘোষণার পর গড়ে প্রতিটি আসনে ১০ জনকে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছে। অর্থাৎ দেশব্যাপী ৩ হাজার ৩২ জন নেতা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এখন ১১ জনের মধ্যে এই গড়ে ১০ জন এবং তার সমর্থকরা কি মনেপ্রাণে দলের স্বার্থে মাঠে তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবেন? যদি রাখেন, তাহলে নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে আওয়ামী লীগ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারবে বলে ধারণা করা যায়। আর যদি তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করে এবং নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়, তাহলে এ নির্বাচনকে স্বতঃস্ফূর্ত করে তোলা কঠিন হবে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বারবার দলীয় আদর্শ ও নীতিমালা সবাইকে মেনে চলার জন্য সতর্ক করেছেন এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, মনোনয়ন বঞ্চিতরা বহু ক্ষেত্রে দলের সঙ্গে অসহযোগিতা করে থাকেন। অসহযোগিতা না করলেও অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, যা অসহযোগিতারই শামিল। এ ক্ষেত্রে সংগঠন হিসেবে কতটা দক্ষতা এবং পারদর্শিতা দেখিয়ে আওয়ামী লীগ সব নেতাকর্মীকে চাঙা রাখতে পারে, সেটা দেখার বিষয়।
অন্যদিকে নির্বাচনে না আসা দল বিএনপির মধ্যেও দলীয় কোন্দল রয়েছে। এর আগে আমরা বিভিন্ন জেলায় দলীয় কর্মসূচিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে সংঘাত সংঘর্ষ দেখতে পেয়েছি। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলেরই একটি বহিঃপ্রকাশ তৃণমূল বিএনপি। এ ছাড়াও জেলায় জেলায় কিছু বিএনপির জন সমর্থন থাকা নেতা রয়েছেন, যারা দলীয় সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত মেনে চলছেন বটে; কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে মনে মনে আগ্রহ রয়েছে। এ কারণেই এখন খেলা অনেকটা তৃণমূল বিএনপির হাতে, দলটি আপাতদৃষ্টিতে যত ছোটই হোক। তারা যদি জেলা পর্যায়ের কিছু নেতাকে মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনে নিয়ে আসতে পারেন, নিজেদের দল ভারী করার স্বার্থে, তাহলে বিএনপির আন্দোলন খানিকটা হলেও শক্তি হারাবে। সরকারপ্রধান বারবার জোর দিয়ে বলছেন, এবারের নির্বাচন স্বচ্ছ করতে তিনি বদ্ধপরিকর। অর্থাৎ ২০১৪ অথবা ২০১৮ সালের মতো বিতর্কিত নির্বাচন তিনি দেখতে চান না। সে ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য হওয়ার লোভনীয় হাতছানিতে সাড়া দিতে পারেন বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠীর কেউ কেউ।
নির্বাচনে কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকবেন বিভিন্ন এলাকায়। এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন, যদি নির্বাচন সত্যিই সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয়। বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় জনগণের একটি বিরাট অংশ দলের চেয়ে ব্যক্তির ইমেজের ওপর নির্ভর করে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন। জনগণের মধ্যে যদি এমন ধারণা জন্ম নেয় যে, তার ভোটটি কাউন্ট হবে, তাহলে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে তারা উপস্থিত হবেন, এতে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও। এমনকি বিএনপি সমর্থকরাও আসবেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী কাউকে ভোট দেওয়ার জন্য।
বর্তমানে বিএনপি, জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর আন্দোলনের যে ধরন, তাতে মনে হচ্ছে না, তারা এই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত বা স্থগিত করতে পারবে। কেবল অগ্নিসংযোগের সংখ্যাই বৃদ্ধিই পেতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্য কোনো স্বপ্ন দেখার সুযোগ আছে বলে এখন আর মনে করা যায় না। তবে এটাও ঠিক নির্বাচন স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে পারলে এবং পার্লামেন্টের বিরোধী দলের আসনগুলো ভরে উঠলে দেশের সাধারণ মানুষও নির্বাচনকে সার্টিফাই করবে। অন্তত নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার তীব্র কোনো ক্ষোভ থাকবে না। জাতীয় পার্টি দেশব্যাপী মনোনয়ন দিচ্ছে। দলটি বেশ নড়েচড়ে উঠেছে। এই দল সামনের দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনীতিও ক্রিকেটের মতো অনিশ্চয়তার খেলা। ৬ বলে ৩৬ রানের প্রয়োজন হলেও জেতার সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া যায় না। তবে একথাও মনে রাখতে হবে, ৬ বলে ৫০ রানের প্রয়োজন হলে তাকে আর সম্ভাবনার মধ্যে রাখা যায় না। মুশকিল হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোন দলের কত বলে কত রান প্রয়োজন, সেটাই আমাদের জানা হয়ে ওঠেনি। আমরা যা বলছি তা প্রায় সবটাই তথ্য ও ধারণাভিত্তিক। তাই ইনিংসের আরও খানিকটা সামনে বাড়াতে হবে। এটি ‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ’।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে