'রাজশাহীতে পুলিশ হেনস্থা নির্বাচনের জন্য বড় হুমকি'
দুর্ঘটনা জড়িত বাসচালক ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় 'গুজব' ছড়িয়ে পুলিশের সদস্যকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে হেনস্থার ঘটনা ঘটেছে। এটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ নির্বাচনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।
সোমবার দুপুরে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র গাজিউর রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর চালক না থেমে পালিয়ে যায়। তারপর একটি ফিলিং স্টেশনে বাস রেখে সে পালায় সে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনী প্রক্রিয়া শুরু করে। এসময় একটি চক্র গুজব ছড়িয়ে মব সৃষ্টি করে পুলিশকে সামাজিকভাবে চরম হেনস্তা করে। আসামি ছেড়ে দেয়ার ঘটনাটি পুরোপুরি গুজব। এর কোনো সত্যতা নেই।
তিনি আরো বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ কর্মকর্তারা গিয়ে ওসি ও এসআইকে উদ্ধার করেন। এ দুর্ঘটনার ব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা না হলেও পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। ইতোমধ্যে বাসটি জব্দ করা হয়েছে। বাসের চালকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। মবে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সন্ধ্যা ৫টার দিকে রাজশাহীর বেলপুকুর এলাকায় বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিহত হন। এছাড়া আহত ৬-৭ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও এক নারী ও পুরুষের মৃত্যু হয়। এ দুর্ঘটনার পরই উত্তেজিত জনতা ও নিহত শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে বেলপুকুর থানার ওসিসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় তারা উত্তেজিত জনতার তোপের মুখে পড়ে। এসআইকে কান ধরিয়ে উঠ-বস করানো হয়। সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে দেয়া হয়। এতে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রকে লাঞ্চিত করা হয়ে বলে তাদের দাবি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. ফারহাত তাসনীম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, নিরপেক্ষভাবে সামাজিক মর্যাদা নিয়ে সবার নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরই নাম রাষ্ট্র। সেখানে মব কালচার তৈরি করে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে এইভাবে হেনস্তা করা দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। মানুষ ও মানুষের সাথে যোগাযোগ ও মানুষের সাথে রাষ্ট্রে যোগাযোগ সুন্দর হওয়া দরকার। একটি অপরাধের জন্য আরেকটি অপরাধ করা সুস্থ মানুষের লক্ষ্য নয়। এটা আইনের মাধ্যমে সমাধান হওয়া দরকার।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এ কে এম মাহমুদুল হক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, দুর্ঘটনা বিষয়টি খুব দুঃখজনক। তবে এটাকে পুঁজি করে রাষ্ট্রের একটি আইনশৃংখলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের লাঞ্চিত করা এটি আরো বেশি দুঃখজনক। সবাইকে আইনের আওতায় আনা উচিত। তা নাহলে এটি বুমেরাং হয়ে ফিরবে। মব কালচার বন্ধ করা খুবই জরুরি। পুলিশের মত একটি বাহিনী লাঞ্চিত করা, সেটা আবার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া দেশের জন্যেই লজ্জার। এটি আসন্ন নির্বাচনের জন্য খুবই বড় একটি হুমকি।
রাজশাহী জেলা নির্বাচন অফিসার মো. মোতাওয়াক্কিল রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, এটি নির্বাচনের জন্যে হুমকি কি না এ বিষয়ে আমি কথা বলার এখিয়ার রাখি না। জেলা প্রশাসক ও রির্টানিং কর্মকর্তা মহোদয় সব বলতে পারবেন।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও রির্টানিং কর্মকর্তা আফিয়া আখতারের সাথে একাধিকবার চেষ্টা করে যোগাযোগ করা যায়নি।
পবা হাওয়ে থানার ওসি মোজাম্মেল হক কাজী বলেন, দুর্ঘটনায় কবলিত অটোরিকশাটি পুঠিয়ার দিকে যাচ্ছিল। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাস অটোরিকশাটি চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই শান্ত নিহত হন। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার পথে একজন পুরুষ ও একজন নারী মারা যান। তবে প্রাথমিক অবস্থায় তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
নিহতরা হলেন রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিপল-ই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত ইসলাম। এছাড়া একজন নারী ও পুরুষের (৪০) মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় আহতরা হলেন পুঠিয়ার আটভাগা এলাকার ময়নুল ইসলামের ছেলে মুকুল হোসেন (৩৫), সিংহপাড়ার মুশা মন্ডলের ছেলে মোজাম্মেল হক (৫০), পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার এরশাদ আলীর ছেলে রিফাত হোসেন (৩০), একই উপজেলার মোজাম্মেল হকের ছেলে রুহুল আমিন (৪০) ও দুই শিশু। কর্তব্যরত চিকিৎসক সকলকেই মেডিকেলের ৮ ও ৩১ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করেন।
রামেক হাসপাতালে মুখপাত্র ও জরুরী বিভাগের চিকিৎসক শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘পুঠিয়া থেকে হাসপাতালে দুজনকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও ছয়জন আহত অবস্থায় এসেছেন। তাদের হাসপাতালের ৮ ও ৩১ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে। এছাড়া নিহত দুজনের মরদেহ রামেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে