কবি, কথাসাহিত্যিক মুজতবা আহমেদ মুরশেদের জন্মদিন আজ
আজ (ফেব্রুয়ারি ১৪) কবি, কথাসাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুজতবা আহমেদ মুরশেদের জন্মদিন। ১৯৬১ সালের আজকের দিনে তিনি দিনাজপুর শহরের বালুয়াডাঙ্গা মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকাস্থ জাপান ও জার্মান দূতাবাসে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে দীর্ঘ পঁচিশ বছর কর্মরত ছিলেন তিনি। এরপর, পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেন। পেশাগত কাজের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থেকেই তার নিমজ্জণ গল্প, কবিতা, নাটক, ছড়া, আর গান রচনার ভুবনে। চার দশকেরও অধিকসময় ধরে কবিতা, গল্প, নাটক ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক পরিসর।
তার লেখার মধ্যে অসংখ্য গল্প ও কবিতা রয়েছে, রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবন্ধ আর শিশুসাহিত্য। এছাড়াও সমসাময়িক রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক ইস্যু নিয়ে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে লেখালেখি তো চলছেই। এখন পর্যন্ত তার ৮টি কবিতার বই, শিশুদের জন্য ২টি ছড়ার বই, ৩টি গল্পের বই, মুক্তিযুদ্ধের উপরে কিশোর উপন্যাস এবং ৫টি ছোটগল্পের সংকলন বের হয়েছে। তার গবেষণা গ্রন্থ 'রবীন্দ্রনাথ : জীবনকে যেমন দেখেছেন' বিশ্লেষকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
দিনাজপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই লেখক শুধু শব্দচর্চা করেন না, বরং সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম, অর্থনীতি এবংমানবিকতার জটিল বিন্যাসকে সাহিত্যের প্রতীকী কাঠামোয় রূপান্তরিত করেন অসামান্য দক্ষতায়।তার গল্পে আছে বাস্তবতা, আছে কল্পনার তীব্র প্রতিফলন, আবার আছে সামাজিক ও আত্মিক সংকটের অন্তর্নিহিত বিশ্লেষণ। সর্বোপরি তার গল্পে নিবিড়ভাবে উঠে এসেছেবাঙালি জাতির মানসজাত সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি, নান্দনিকভঙ্গি ও গভীর মানবিক দায়বোধের বহুমাত্রিক পরিচয়।
তার সাহিত্যকর্ম শুধু গল্প নয়, বরং ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এক একটি জটিল প্রতীকী নির্মাণ; যেখানে ধর্ম, যৌনতা, শ্রেণিবিভাগ ওরাজনীতি একে অপরকে পুষ্ট ও বিকৃত করে তোলে। তার গল্পের ভাষা অত্যন্ত জীবন্ত ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। লেখক অনায়াসে দৈনন্দিন গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যাতে পাঠক শুধু দেখতে পায় না, বরং গন্ধ পায়, ছুঁতে পারে, এবং এমনকি গল্পের চরিত্রগুলোর শ্বাসপ্রশ্বাসও টের পায়।
একজন লেখক কেবল তখনই স্মরণীয় হয়ে ওঠেন, যখন তিনিনিজ সময়কে অতিক্রম করে পাঠকের অন্তরে নেমে যেতেপারেন; মুজতবা আহমেদ মুরশেদ তেমনই একজন লেখক, যিনি তার সময়কে ধারণ করেছেন, প্রতিফলিত করেছেন, আবার অতিক্রমও করেছেন শিল্পের তীব্র আলোয়।
কেবল সাহিত্যকর্মই নয়, সৃষ্টিশীল আরো অনেক কাজে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। লেখালিখির পাশাপাশি চ্যানেল ওয়ান ও জিটিভিতে ক্যারেন্ট অ্যাফেয়ার্স টকশো করেছেন। একইসাথে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে একুশে টেলিভিশনে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান ইচ্ছেঘুড়ি পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেছেন। রচনা করেছেন বেশ কয়েকটি নাটক এবং গান লিখেছেন শতাধিক।
তার পিতা এডভোকেট মো আজিজুর রহমান, এমএনএ ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সফলতায় অন্যতম কারিগর। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক এবং মুক্তিযুদ্ধের ৭ নং সেক্টরের লেফটান্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদার সিভিল এ্যফেয়ার্স অ্যাডভাইজার। মা মোসাম্মত সমিদা ছিলেন একজন রাজনৈতিক এবং সমাজকর্মী।
সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে তিনি ২০০৫ সালে মাটি ও মানুষের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রয়োজনে তৈরি করেছেন স্বভূমি লেখক শিল্পী কেন্দ্র এবং বর্তমানে তিনি স্বভূমি’র সভাপতি।
ভ্রমণ করবার তার প্রবল নেশায় তিনি স্বদেশ ছাড়াও ঘুরে বেড়িয়েছেন সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, আমেরিকা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইতালি, ভারত আর নেপালের বিস্তৃত জনপদ।
মতামত দিন