Views Bangladesh Logo

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগে ফের উত্তপ্ত হচ্ছে ফুলবাড়ী

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি উত্তোলন নিয়ে সরকারের নতুন ইঙ্গিতে প্রায় দুই দশক পর ফের তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে গেলে রাজপথে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

এ ইস্যুতে ইতোমধ্যেই আন্দোলন শুরু হয়েছে। 'গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি' ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছে, যা বুধবার (২৬ আগস্ট) গণসমাবেশের মাধ্যমে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, বুধবার সকালে ফুলবাড়ীতে এক প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করেছে ‘গণসংহতি আন্দোলন’।

বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে গত ১৬ আগস্ট ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের এক সভায় অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরকার কয়লা উত্তোলনের দিকে হাঁটছে এবং ফুলবাড়ীসহ অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর হলেও তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে বেশ কিছু কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি খাতে কয়লার নির্ভরতা বাড়ছে। দেশে বছরে ১৮ থেকে ২০ মিলিয়ন টন কয়লার চাহিদার বিপরীতে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে মাত্র ৭ লাখ ৫০ হাজার টন সরবরাহ পাওয়া যায়; বাকিটা আমদানি করতে হয়। সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি চালু হলে বছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন সম্ভব, যা আমদানি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।

উল্লেখ্য, দেশের পাঁচটি আবিষ্কৃত কয়লাখনির মধ্যে জামালগঞ্জে ৫.৪৫ বিলিয়ন টন, খালাসপীরে ৬৮৫ মিলিয়ন টন, দিঘীপাড়ায় ৭০৬ মিলিয়ন টন, বড়পুকুরিয়ায় ৪১০ মিলিয়ন টন এবং ফুলবাড়ীতে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞ ও আন্দোলনকারীরা উন্মুক্ত পদ্ধতির কঠোর বিরোধিতা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বদরুল ইমাম মনে করেন, ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এই পদ্ধতি একেবারেই অনুপযোগী। কারণ এটি কৃষি জমি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে।

ফুলবাড়ীবাসীর জন্য এই ইস্যুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট যুক্তরাজ্যভিত্তিক এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলের ওপর পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআর গুলি চালালে ৩ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। আন্দোলনের মুখে ৩০ আগস্ট তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একটি ৬ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তিতে ফুলবাড়ী বা দেশের অন্য কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি উত্তোলন না করা এবং এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বিতাড়নের স্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল।

চুক্তির বহু দফা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘আমরা সহজে ভিটামাটি ছাড়ব না।’

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, উন্মুক্ত খনির যেকোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে আবার রাজপথে রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ