Views Bangladesh Logo

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার সাংবাদিকের ওপর হামলায় পেন ইন্টারন্যাশনালের নিন্দা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের (জেসিডি) সদস্যদের বিরুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক লেখক সংগঠন পেন ইন্টারন্যাশনাল। এ ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির প্রেক্ষাপটে এ আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে পেন ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, গত ৪ অক্টোবরের হামলা সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন। এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সাংবাদিকদের মধ্যে স্বনিয়ন্ত্রণ বা ভয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকার প্রবণতা বাড়ায়।

সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ছাত্রসংসদের এক নেতাকে হামলার উদ্দেশ্যে দেশীয় ধারালো অস্ত্র, হকিস্টিক ও ব্যাট হাতে একদল ছাত্রদলকর্মী জড়ো হয়েছিলেন। ওই ঘটনা নথিবদ্ধ করার সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দ্য ডেইলি স্টার–এর নূর আহসান মৃধুল, আগামীর সময়–এর জাহিদুল ইসলাম, বিডিনিউজ২৪ ডটকম–এর আরিফুজ্জামান করবান এবং সমকাল–এর মাইনুল ইসলাম রাজু।

পেন ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতিতে বলা হয়, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। সহকর্মীরা তাঁদের রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাঁদেরও হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া সাংবাদিকদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া এবং ঘটনার ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

পেন ইন্টারন্যাশনালের রাইটার্স ইন প্রিজন কমিটির চেয়ার মা থিদা বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা শুধু তাঁদের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, জনগণের তথ্য জানার অধিকারকেও বিপন্ন করে।

তিনি বলেন, ‘মৌলিক অধিকার রক্ষার দাবি করা কোনো রাজনৈতিক দল সংবাদমাধ্যমের ওপর সহিংসতা মেনে নিতে পারে না কিংবা দায়ীদের জবাবদিহির বাইরে থাকতে দিতে পারে না।’ সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থানায় মামলা করেছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রদল পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে পেন ইন্টারন্যাশনালের ভাষ্য, বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় ছাত্রদল দুই নেতাসহ এক কর্মীকে বহিষ্কার করেছে বলে জানা গেছে।

সংগঠনটি বলেছে, দলের অভ্যন্তরীণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ফৌজদারি অপরাধের দায় নির্ধারণের বিকল্প হতে পারে না। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত, পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনার আগে ও পরেও সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির একাধিক ঘটনা ঘটেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। গত ১৫ অক্টোবর উত্তরাঞ্চলে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ গুলিতে নিহত হন। দুর্নীতি ও অপরাধী চক্রের কথিত কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন তিনি।

এর আগের দিন কুষ্টিয়ায় ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত তিন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ করা হয়। সংঘর্ষের দৃশ্য ধারণের সময় দলীয় কর্মীরা সাংবাদিকদের বাধা দেন এবং তাঁদের ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার চেষ্টা করেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ২৫ আগস্ট শরীয়তপুরে বিএনপির একটি সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহের সময় তিন সাংবাদিক দলটির নেতা-কর্মীদের হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ করেছে পেন ইন্টারন্যাশনাল। তাঁদের একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির এক নেতা তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নেন, প্রেস পরিচয়পত্র ছিঁড়ে ফেলেন এবং আরও হামলার হুমকি দেন। ওই নেতা সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার জন্য দলের কাছে তালিকা রয়েছে বলেও দাবি করেছিলেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

পেন ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস শুধু আগস্ট মাসেই সাংবাদিকদের ওপর হামলা, আইনি হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ৫১টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও স্মরণ করেছে সংগঠনটি। ওই সময় হামলাকারীরা ভবন দুটিতে আগুন ধরিয়ে দিলে পত্রিকা দুটি সাময়িকভাবে প্রকাশনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

বিবৃতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের উদ্বেগের কথাও তুলে ধরা হয়। ওই দপ্তরের পর্যবেক্ষণ ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার দায়ীদের বিরুদ্ধে পরিণতিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে হামলা ও হুমকির ঘটনাগুলোকে কার্যত স্বাভাবিক হতে দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের ধারাই অনেকাংশে অনুসরণ করেছে।

পেন ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে বলেছে, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে না। সাংবাদিকদের সুরক্ষা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠায় হামলার ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ