বাজেট প্রশংসায় কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে সংসদে বিতর্ক
প্রস্তাবিত বাজেটের প্রশংসা করতে গিয়ে কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা টানা নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্কের ঘটনা ঘটেছে। পরে বিষয়টিকে ‘স্পর্শকাতর’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ভুল ব্যাখ্যা হয়ে থাকলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন কক্সবাজার-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। তিনি বাজেটকে ‘জনস্বস্তির বাজেট’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
সরকারি দলের এই সদস্য বলেন, ‘এবারের বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়েনি। সাধারণ লোকজন রাস্তায় মিছিল মিটিং করেনি, যেটা দেশ স্বাধীনের পর একটি বিরল ঘটনা।’ তিনি দাবি করেন, চাল, ডাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ, রসুন, চিনিসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ও মৌলিক কৃষিপণ্যে আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমানোয় বাজেটের পর দাম বাড়েনি।
বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে আলমগীর ফরিদ বলেন, ‘খালি আমাদের ডান পাশের বন্ধুরা কেন সেদিন মিছিল করেছিলেন, জানতে পারি নাই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এসে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে, আমাদের মাননীয় মন্ত্রীদের কাছে বাজেট চাইবে, বরাদ্দ চাইবে, কিন্তু রাস্তায় গিয়ে মিছিল করবে। সে কারণে আমি একটি আল কোরআনের আয়াত বলতে চাই।’
“…‘লা-ইন শাকারতুম লা-আজিদান্নাকুম, ওয়া লা-ইন কাফারতুম ইন্না আজাবি লাশাদিদ’। শোকর করতে হবে জীবনের, শোকর করতে হবে বরাদ্দের, শোকর করতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। শোকর করতে হবে আমাদের মাননীয় মন্ত্রীদের।”
তিনি বলেন, “তারা শোকর করে না, কিন্তু অস্বীকার করে। সেই জন্য তাদের ওপর ‘লা শাদিদুল’ আজাব, আজাবের কঠিন আজাব তাদের সম্মুখীন করতে হবে।”
আলমগীর ফরিদ আরেকটি আয়াত উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, ‘ওয়া মাকরু, ওয়া মাকারাল্লাহ, ওয়াল্লাহু খাইরুল মাকিরীন’। তোমরা বলেছ, তোমরা বুঝেছ, তোমরাই কৌশলী, আপনারাই কৌশলী। কিন্তু আল্লাহ বলছেন, আমি শ্রেষ্ঠ কৌশলী। আর যারা আমার সাথে কৌশল খাটায়, তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়।
আলমগীর ফরিদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মোমেন আপত্তি জানান। তিনি বলেন, ‘কোরআন হাদিসের আয়াত এবং যে রাসুল (সা.) বাণীগুলো আছে, এগুলো তো আসলে ঠাট্টা-বিদ্রুপের বিষয় না। এটা নিয়ে যদি ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়, তাহলে আসলে খুবই দুঃখজনক।’
‘কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করা হয়েছে… ওনাদের প্রশংসা করলে ওনারা আরো বাড়াই দিবেন, আর ওনাদের ইয়ে না করলে, ওনারা কি পিটাবেন নাকি? এ ধরনের বোঝাতে চাচ্ছেন; এটা তো আসলে ভুল ব্যাখ্যা হচ্ছে। এটা খুব ভুলভাল বিষয়।’
নজিবুর রহমান বলেন, ‘রাসুলের কঠোর সতর্কবাণী এসেছে যে এগুলা বিষয় ঠাট্টা বিদ্রুপ করার বিষয় না।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ের একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘‘সে সময়, শাহবাগের সময় কোরআন-হাদিস নিয়ে অনেক বিদ্রুপ হচ্ছে, ঠাট্টা-তামাশা হচ্ছে। সে সময় একটা চিঠি লেখা হয়েছিল, সে চিঠি নিয়ে যখন আমরা গেলাম, তিনি বলেন, ‘কোরআনের একটা আয়াত, তওবার একটা আয়াত যুক্ত তোমরা যোগ করতে পার না’?’’
‘‘ ‘কুল আবিল্লাহি ওয়া আয়াতিহি ওয়া রাসুলিহি কুনতুম তাস্তাহজিউন’। আল্লাহ কে নিয়ে, আল্লাহ রাসুলকে নিয়ে তোমরা কি ঠাট্টা মশকরা করতেছ, এটা যদি তোমরা কর, তাহলে তোমাদের অবস্থান হবে জাহান্নামে।”
বিরোধী দলের এই সদস্য বলেন, ‘কোরআন হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা, কোরআন হাদিসের এরকম অবমাননাকর বিষয়গুলো আমাদের কোনোভাবে করা যাবে না। এ ব্যাপারে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, মাননীয় স্পিকার।’
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আলমগীর মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ একজন পুরনো সংসদ সদস্য। আমার মনে হয় না যে কোরআন হাদিস নিয়ে তিনি কোনো ব্যঙ্গাত্মক কমেন্ট করতে পারেন।’ তবে বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘যদি কোনো ভুল ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় কোরআন হাদিসের, সেটা ‘এক্সপাঞ্জড’ হবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘কোরআন হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা, বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ, এ দেশে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।’
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমি বিতর্কে যাব না। কিন্তু একটা ভুল ম্যাসেজ যাবে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যখন একটা অভিযোগ আকারে, বা যে কোনো আকারে বলা হোক যে কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন।’
আলমগীর ফরিদকে মাদ্রাসাশিক্ষিত ও আলেম হিসেবে তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি অন্তত এই উদ্দেশ্যে এটা বলেননি। …যেটা উনি বলেছেন, সেইটা প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন। আমরা যদি আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি, আল্লাহ আমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেন। যদি শুকরিয়া আদায় না করি…আল্লাহ আজাব বাড়িয় দিতে পারেন।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এইটা ‘পলিটিক্যালি’ বক্তব্য কেন হবে?” এ বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেওয়া ঠিক হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
“ইনি বলেছেন, সৎ উদ্দেশ্যেই বলেছেন এবং আমরা যেন আল্লাহ শোকর গুজার করি। এটাকে ‘পলিটিক্যালি মিসইন্টারপ্রেট’ করা ঠিক হবে না।
“আমরা এই ৯২ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার দেশে, আমাদের এই মহান জাতীয় সংসদে কোনো সংসদ সদস্যের বক্তব্য যদি ভুলোক্রমেও ইসলামের প্রতি অবমাননামূলক হয়, এটা আমরা নিন্দা করব। কিন্তু এইভাবে ‘পলিটিক্যালি ইউজ’ করা ঠিক হবে না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার আবার বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংসদে বিতর্ক চলুক, তা তিনি চান না। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই মুসলমান। এখানে অধিকাংশই মুসলমান। এই দেশটারও ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান। সুতরাং এগুলো নিয়ে সংসদে কোনো রকম বিরূপ আলোচনা হোক, এসব স্পর্শকাতর বিষয়, এটা তো চাই না।’
তখন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার বলেন, বিতর্ক সৃষ্টি হয় এমন কিছু না তুলতে।
পরে মুজিবুর রহমান বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আয়াতটি নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট হচ্ছে আল্লাহতাআলা অগণিত নেয়ামত পৃথিবীতে রেখেছেন। তিনি বলেছেন…তোমরা যদি আল্লাহ নেয়ামতকে গুনতে চাও তাহলে গুনে শেষ করতে পারবে না।’
‘যারা আল্লাহর এই দুনিয়ায় আল্লাহ নেয়ামত ভোগ করছে, আমি কথা বলছি, আল্লাহ আমাকে একটা নেয়ামত দিয়েছেন, অতএব আমার মুখ দিয়ে আল্লাহ বিরুদ্ধে কোনো কথা আমি বলতে পারি না। আমাকে যে শক্তি আল্লাহ দিয়েছেন এই শক্তি দিয়ে আল্লাহর বিধানের পক্ষে কথা বলতে হবে।’
এ পর্যায়ে স্পিকার তাকে থামিয়ে দিতে চাইলে মুজিবুর রহমান কথা শেষ করতে চান। তিনি বলেন, ‘বাজেটটা খুব ভালো হয়েছে, অতএব বিরোধী দলকে বাজেটের প্রশংসা করতে হবে। এটা যদি প্রশংসা না করে, তার আজাব আসবে, এইদিকে নিয়ে গেছেন উনি। এই কথাটা মোটেও সঠিক না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওই আয়াতে কোনো মানুষের অবদানের কথা বলা হয়নি।’
এরপর মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, তিনি আলেম-ওলামাদের মাঝখানে থেকে কথা বলছেন; ভুল হলে তারা সংশোধন করবেন।
পরে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সিনিয়র নেতারা দাঁড়ালে অন্য সদস্যদের বসে থাকা উচিত এবং সিনিয়রদের কথা বলতে দেওয়া উচিত।
আলমগীর ফরিদের বক্তব্যের প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, ‘তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছেন কি না, তা তার কাছেই জানতে চাওয়া যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেছেন নাকি হৃদয় খুলেই কথাটা বলেছেন যে আমরা সবাই যেন সহিভাবে গ্রহণ করতে পারি, এই কথাটা তো মাহফুজ উল্লাহ সাহেব স্বীকার করেন যে আমরা যে কথাটা বলেছি, সেটা কোনো ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলি নাই।’ এরপর তিনি এই বিষয়ে আলোচনা শেষ করার জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান।
মতামত দিন