Views Bangladesh Logo

মুগ্ধ-সিদ্ধার্থের গ্রেপ্তার নিয়ে বাবা-মায়ের প্রশ্ন

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজনের পরিবারের সদস্যরা তাদের সন্তানদের জড়িত থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ ঘটনার সঠিক তদন্ত চেয়েছেন। তারা বলছেন, তাদের সন্তানরা এই ঘটনা ঘটাতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না।

শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া এলাকার মুগ্ধ দাস (২৩) ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটকের কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ নগরীর একটি জুয়েলার্সে এবং মুগ্ধ সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কাজ করতেন। রোববার তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশের ভাষ্য।

আগের দিন দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রোববার ভোরে অভিযান চালিয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান টের পেয়ে পালিয়ে পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুঁতবাগানে লুকিয়ে ছিলেন, পরে তুঁতবাগানের পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর ওই ভবনে বসে খুনিরা ইয়াবা সেবন করেছিলেন এমন আলামতও পাওয়া গেছে।

গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস সোমবার তার বাড়িতে সাংবাদিকদের বলেন, সেদিন রাতে লাশ উদ্ধারের সময় তারাও সেখানে ছিলেন। গভীর রাতে পুলিশ এসে আশপাশের বাড়িগুলো কার তা জানতে চায়, পরে ছেলে মুগ্ধর কথা জানতে চেয়ে তাকে ডেকে আনতে বলে। মুগ্ধ তখন তার ভাইয়ের বাসায় ঘুমিয়েছিল। কানু দাস পুলিশকে নিয়ে সেখানে যান এবং ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দেন। পুলিশ তাকে মুগ্ধকে চেনে কি না জিজ্ঞাসা করে; তখন ছেলের গায়ে একটি ঘিয়ে রঙের গেঞ্জি ছিল, সেটা পরেই সে ঘুমিয়েছিল এবং সেটা পরেই পুলিশের সঙ্গে গিয়েছিল। এরপর পুলিশ সিদ্ধার্থকে নিয়ে মুগ্ধের বাসায় যায়। কানু দাস নিজের বাড়িতে ফিরে আসার ঘণ্টাখানেক পরে জানতে পারেন, তার ছেলেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং ইয়াবা খেয়ে সে খুন করেছে বলে তাকে জানানো হয়।

কানু দাস বলেন, ‘আমার ছেলেতো নেশাগ্রস্ত ছিল না। এমন কোনোদিন কিছু দেখিনি। কারণবশত যদি হয়েও যায়, আমি আর কীভাবে বলব। কে কখন নেশা করে কেউ কি বলতে পারবে? কে চায় না তার ছেলে ভালো থাকুক। আমার ছেলের চুরি-ধারি বা এসবের কোনো রিপোর্ট নাই। হাসিখুশি একটা ছেলে। ছোটদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। এলাকায় গিয়ে আপনারা জিজ্ঞাস করেন। বৃহস্পতিবার রাতে খাবার-দাবারের পর ছেলেকে ঘুমাতে যেতে বলি। তখন ছেলে বলে, সিদ্ধার্থের সঙ্গে থাকব। ছেলেরতো বন্ধু। সিদ্ধার্থও আমার বাসায় অনেক থেকেছে। ও তার বাসায় গিয়ে থাকে। ওরা দুজন একসঙ্গে বড় হয়েছে। একসঙ্গে থাকতেতো কোনো বাধা-নিষেধ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছেলে খুন করেছে জানলেতো আমি প্রথম থেকেই আতঙ্কিত থাকতাম। তাহলে শুক্রবার বাসায় খাওয়া-দাওয়া বা বাসায় থাকতাম কী করে।’

একই ধরনের সন্দেহের কথা বলেছেন গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে নিয়মিত কাজে যেত, বাসায় আসত। ছেলে আমার এত খারাপ ছিল না। মা হয়ে আমি কিছুটাতো বুঝতে পারি। কিন্তু এখন কীভাবে কী হলো সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’ ছেলে এই ঘটনা ঘটাতে পারে কি না জানতে চাইলে সেনা দাস বলেন, ‘ছেলে দুইটা উপযুক্ত না। নাকি এর পেছনে আরও কেউ আছে সেটা সঠিক তদন্ত করে দেখা হোক। যদি ছেলে এটা করে থাকে, তাহলে সে উচিত শাস্তি পাক। আর আমার ছেলে যদি দোষী না হয়, তাহলে তাকে ছাড়া হোক। একটা-দুইটা না চারটা মানুষকে হত্যা করা। দুইটা ছেলে কীভাবে করল, সেটাই প্রশ্ন।’

গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের পরিবারের এই প্রশ্নগুলো এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন এই মামলার তদন্ত নিয়ে ইতিমধ্যে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, আটক ব্যক্তিদের একজনের গায়ে থাকা শার্টের সঙ্গে রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর গায়ে ঘটনাস্থলে থাকা শার্টের মিল নিয়ে ওঠা প্রশ্ন, যা নিয়ে তিনি নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন এটি একটি সাধারণ ব্র্যান্ডের শার্ট এবং কাকতালীয় মিল মাত্র। এ ছাড়া ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য ও পুলিশ কমিশনারের প্রাথমিক ব্রিফিংয়ের মধ্যেও কিছু অংশে (যেমন চোয়াল ভাঙার তথ্য নিয়ে) অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। এসব প্রশ্নের কোনোটিরই এখনও চূড়ান্ত সুরাহা হয়নি, এবং পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও সিআইডি ল্যাবের ফলাফল হাতে পাওয়ার পর তারা দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।


মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ