‘বন্দুকের নল ধরে রেডিওতে ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার বন্ধ করেছিল পাকিস্তানি সেনা’
অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খান দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক। বাংলাদেশের গণমাধ্যম, ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শিক্ষার জগতের এক মহীরূহ। সাংবাদিক সাখাওয়াত আলী খানের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার খুবই সমৃদ্ধ।তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন সোনার বাংলা নামের একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে। সেখান থেকে যোগ দেন পয়গাম-এ। এরপর ১৯৬৫ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি যোগ দেন দৈনিক পাকিস্তানে। দৈনিক পাকিস্তান ছিল ন্যাশনাল প্রেস ট্রাস্টের সংবাদপত্র। সংবাদপত্রটি যাত্রা শুরু করে ১৯৬৪ সালের ৬ নভেম্বর। ১৯৭১ সালে সাখাওয়াত আলী খান দৈনিক পাকিস্তানে সিনিয়র সাব এডিটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ৭ মার্চ ১৯৭১ তার কোন এ্যাসাইমেন্ট না থাকলেও একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি উপস্থিত ছিলেন রেসকোর্স ময়দানে। তার সেই অভিজ্ঞতার কথা ভিউজ বাংলাদেশ তুলে ধরছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহরকারী অধ্যাপক রাহাত মিনহাজের সৌজন্যে।
রাহাত মিনহাজ: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে জানতে চাই। আপনি এই ভাষণটি কিভাবে শুনেছিলেন?
সাখাওয়াত আলী খান: বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিনে আমি রেসকোর্সের মাঠে ছিলাম। আমি অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম যদি লেখার মতো কিছু পাই, তবে লিখে ফেলবো। বর্তমানে যেটি আর্ট কলেজ (চারুকলা ইনস্টিটিউট) সেই গেট দিয়ে আমি মাঠে ঢুকেছিলাম। ভিতরে মাইকের নিচে এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছিলাম, যেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখাও যায় আবার তার কথা পরিষ্কার শোনাও যায়। আমার সাথে আমার এক সাংবাদিক বন্ধুও ছিলেন। আমরা দাঁড়িয়ে পুরো বক্তৃতা শুনেছিলাম।
ওই সময় রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে) কিছু ছোট ছোট টিলা ছিল। পাহাড়ের মতো। তার উপরে কিছু ঘরও ছিল। ছিল বারান্দা। সেই ঘরে সেদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসাররা বসেছিলেন। আমি পরিষ্কারভাবে তাদের দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেওয়ার সময় আমাদের মাথার ওপর দিয়ে আর্মির বড় বড় হেলিকপ্টার উড়ছিল। যখন রেসকোর্স ময়দানে ঢুকছিলাম, বর্তমানে ফুলের দোকানগুলো যেখানে আছে, সেখানে সে সময় আমি সারি সারি আর্মির ট্রাক দাঁড় করানো অবস্থায় দেখেছি। পাশেই ছিল মূল রেডিও অফিস (তৎকালীন পিজি হাসপতালের পূর্বে)। আমরা পরে জেনেছি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রেডিও’র অফিসে ঢুকে বন্দুকের নল ধরে বলেছে- বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা যাবে না। তখন রেডিও অফিস আর প্রচার করতে পারেনি। কিন্তু পরদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিও প্রচার করেছিল। একাধিকবার প্রচার করেছিল। বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেওয়ার সময় পাশে দেহরক্ষী মহিউদ্দীন দাঁড়িয়ে ছিলেন।
রাহাত মিনহাজ: ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে আপনার আর অন্য কোন মূল্যায়ন বা স্মৃতি?
সাখাওয়াত আলী খান: পুরো ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল দেখার মতো। বঙ্গবন্ধু কীভাবে উচ্চারণ করেছিলেন, তর্জনী তুলেছিলেন এগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বা পাকিস্তান টেলিভিশনতখন সে রকমভাবে ডেভোলপ করেনি, তাদের হয়তো প্রস্তুতি ছিল ভাষণটি রেকর্ড করে পরে দেখানোর। সে সময় সরাসরি দেখানোর টেকনোলজিও আজকের মতো উন্নত ছিল না। তবে বেতার যথেষ্ট উন্নত ছিল। সরাসরি সম্প্রচারের সামর্থ্য ছিল। কথা ছিল বাংলাদেশ বেতার ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করবে। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু ভাষণটি একটু দেরিতে শুরু করলেন।
বঙ্গবন্ধু শুরু করার আগেও রেডিওতে ঘোষণা চলছিল। যখন একজন অ্যাংকর (উপস্থাপক) বললেন, এখন সরাসরি ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। ঠিক সেই মুহুর্ত... যখন ভাষণ শুরু হবে, ঠিক সেই সময়েই রেডিও একেবারে অফ হয়ে গেল। কোনো কথা নাই বার্তা নাই, একবারে অফ। পরে বোধ হয় কিছু গান বাজনা অথবা কোরআন তেলওয়াত শুরু হয়েছিল। কোনো ভাষণ প্রচার করা হলো না। তবে রেডিও অফিসের কর্মকর্তা, কর্মচারীরা, তারাও তখন সবাই ছিল শেখ মুজিব তথা স্বাধীন বাংলার পক্ষে। সম্প্রচারের শুরুর সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অর্ডার দিয়ে বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল।
রাহাত মিনহাজ: ৭ মার্চে যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিলেন, অনেক পত্রিকাই পরের দিন বঙ্গবন্ধুর বড় ছবি ছাপলো, ট্রেডমার্ক তর্জনীর ছবি ছাপলো। দৈনিক ইত্তেফাক একটি ডিফেন্সিভ শিরোনাম করলো, পরিষদে যাইবার পারি যদি...। কীভাবে কাভার করেছিল সংবাদপত্রগুলো…
সাখাওয়াত আলী খান: দৈনিক ইত্তেফাক এর ওই রকম শিরোনাম করার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তখনও এমন একটা পরিস্থিতি ছিল যে, পাকিস্তান যদি টিকে যায়! টিকে যেতেও পারে।
এখানে মানিক মিয়ার (তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া) কথা একটু বলতে হয়। ৬-দফা তথা স্বাধীকার আন্দোলনে মানিক মিয়া প্রথমের দিকে অতোটা সাপোর্ট দেননি। তবে পরের দিকে পুরোপুরি সাপোর্ট দিয়েছিলেন। ওই সময় দৈনিক ইত্তেফাক এর সাপোর্টটা খুব জরুরি ছিল। ১৯৬৯ সালে মানিক মিয়া মারা গেলেন। তিনি তো মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারলেন না। পরে অন্যরা দায়িত্বে আসলেন। তাদের আলাদা চিন্তা ছিল। সেজন্যই হয়তো ওই রকম হেডলাইন ছিল-গণপরিষদে যাইবার পারি, যদি...। তবে মনে রাখতে হবে শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণে চারটি শর্ত দিয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় শর্ত ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপরে তিনি ভেবে দেখবেন গণপরিষদে যাওয়া যাবে কি না।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে