ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধে ১৬ মাসে ১১৩ মাজারে হামলা
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গত ১৬ মাসে সারাদেশে অন্তত ১১৩টি মাজার, দরগাহ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাসা সেন্টার ও মাকাম–এর অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। হামলার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ।
মাকামের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে ঢাকা বিভাগের ৯টি জেলায় অন্তত ৩৭টি মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে নরসিংদীতে। রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, রাজবাড়ী ও টাঙ্গাইলেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নারীসহ অন্তত ১৮০ জন আহত এবং দুজন নিহত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগে একই সময়ে অন্তত ২৭টি মাজারে হামলার প্রমাণ পেয়েছে মাকাম। এর মধ্যে কুমিল্লায় সর্বাধিক ১৭টি, চট্টগ্রাম জেলায় ৪টি, নোয়াখালীতে ৩টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২টি এবং কক্সবাজারে একটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় নারীসহ ৩১ জন আহত হন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার প্রধান কারণ ছিল ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ। অনেক ক্ষেত্রে মাজারকে ‘শিরক ও বিদআত’ আখ্যা দিয়ে হামলার পটভূমি তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া সামাজিক অসন্তোষ, জমিসংক্রান্ত বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও কিছু ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। অধিকাংশ ঘটনায় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে বলে দাবি করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো।
গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার দরবার শরিফে হামলার ঘটনা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। সেখানে কবর ভাঙচুরের পাশাপাশি মরদেহ তুলে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন এবং দরবারের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বেশ কিছু ঘটনায় গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে অনেক মামলা এখনও তদন্তাধীন।
মাজারে হামলার ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তুলে ধরে ৫১০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছে রাসা সেন্টার। এ বিষয়ে শুনানি চলমান রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাজারে ধারাবাহিক হামলার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে এসব সহিংসতা বাড়ছে। তারা মনে করেন, নাগরিক ও ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, মাজার, মসজিদ, কবর ভাঙচুর থেকে শুরু করে শিল্পকর্ম, মেলা-খেলা বন্ধের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়ে আসছে। এসব ঘটনায় মাজারপন্থি সাংস্কৃতিক ধারার বিরোধীরা সক্রিয়। অন্যদিকে সুযোগসন্ধানী একটি গোষ্ঠী এসব হামলার আড়ালে লুটপাটে জড়াচ্ছে। সরকার চাইলে তার বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এসব ঘটনার সামগ্রিক পর্যালোচনা ও দায়ীদের চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল।
মাকামের সমন্বয়ক মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, ঢাকা, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের ঘটনাগুলোয় ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে সংগঠিত হামলায় ওরস, মেলা বা সুফি সমাজের অনুষ্ঠানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এসব অনুষ্ঠানকে স্থানীয় যুবকদের চারিত্রিক স্খলনের কারণ হিসেবে অভিযোগের মাধ্যমে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান (ওরস, মেলা, মিলাদ) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীরা ছিল জামায়াতপন্থি, চরমোনাইপন্থি বা কওমি মাদ্রাসার ছাত্র।
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, আমি বা আমরা যা বলি, যা করি সেটাই ঠিক, বাকি সব ভুল– এ ধারণাই ফ্যাসিজম। কেউ কেউ বলছে, মাজার ঠিক না, গান-বাজনা ঠিক না; তাদের মতের বিরোধীদের কতল করতে হবে। তারা আসলে ইসলামবিরোধী। এ দেশে ইসলাম এসেছে পীর-আউলিয়াদের মাধ্যমে। এই বৈচিত্র্যই ইসলামের শক্তি।
সরকারের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উল্লেখ করে মজহার বলেন, সরকার মাজার-দরবার সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। যেভাবে শক্ত হাতে বিশৃঙ্খলাকারীদের মোকাবিলা করা দরকার ছিল, তা করতে পারেনি।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে