কারেন্সির উদ্ভব এবং নোট মুদ্রণে বাংলাদেশ
পৃথিবীতে জীবনধারণের জন্য কোনো প্রাণীর কয়েন বা নোট লাগে না, লাগে শুধু মানবজাতির। তাই মানুষ প্রথম খাবার চায় না, চায় ‘টাকা’। রিজিকের জন্য আমরা সবসময় সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনাও করি, সবার প্রার্থনা কবুল হয় না। কবুল হয় না বলেই সম্ভবত ধনীরা আরও ধনী, গরীবরা আরও গরীব হচ্ছে। দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোরদের টাকার হিসাব তারা নিজেরাও রাখতে পারে না, টাকার হিসাব রাখার জন্য কেউ কেউ আবার লোক রাখে। টাকা দিয়ে কী না হয়, বাঘের দুধও নাকি পাওয়া যায়।
‘টাকা’ আবিষ্কার হওয়ায় বিদেশে পাচারে সুবিধাও হয়েছে। পণ্য বিনিময় প্রথা এখনো চালু থাকলে টাকা পাচারকারীদের পক্ষে কানাডায় বেগমপাড়া গড়ে তোলা সম্ভব হতো না! অবশ্য টাকা বা কাগজের নোটও আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে, এখন ব্যবহৃত হয় ডেবিট কার্ড বা ক্রেডিট কার্ড। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বা ব্যাংকে টাকা জমা রেখে এই দুটি কার্ড দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো দেশে গিয়ে পাওনা পরিশোধ করা যায়, কাগজের নোট এখন আর লোকে সাথে নিয়ে ঘুরে না। লেনদেনের আরেকটি ধারণা সীমিত আকারে কিছু দেশে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং তা হচ্ছে ক্রিপটো কারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন করা। এই কারেন্সি জুয়া খেলায় বেশী ব্যবহৃত হয়; ইতোমধ্যে অনলাইন জুয়া খেলায় প্রচুর অর্থ বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।পৃথিবীতে এই কারেন্সির কোনো অস্তিত্ব নেই; কিছু মানুষ বিশ্বাস করে লেনদেনের জন্য বর্তমান বিশ্বে কারেন্সির অস্তিত্ব থাকা অপরিহার্য নয়।
আমরা প্রায় সবাই জানি, একক বা দলবদ্ধ মানুষ জীবন ধারণের জন্য এক সময় সম্পূর্ণভাবে শিকারের উপর নির্ভরশীল ছিল, শিকার করে যা পেত তা ভাগাভাগি করে খেত। যেদিন মানুষ পাথরকে ঘষে তীক্ষ্ণ করা শিখল সেদিন থেকে শিকার করা সহজ হলো আর আগুন আবিষ্কার যেদিন করল সেদিন থেকে খাওয়ার রুচি পরিবর্তন হলো। মানুষ গুহা ছেড়ে ঘরবাড়ি তৈরি করল, শস্যের বীজ আবিষ্কার করল, গাছের বাকল আর পাতা দিয়ে পোষাক বানালো, আরও কত কত পরিবর্তন।
মানুষ উৎপাদন শিখল। প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিকার বা উৎপাদন নষ্ট না করে বিনিময়ের কৌশল আবিষ্কার করল। জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য বিভিন্ন কলাকৌশল রপ্ত করলেও সভ্যতার প্রথম স্তরে মানুষ টাকাকড়ির ব্যবহার জানতো না। মানুষ তখন পণ্যের সাথে পণ্যের বিনিময় করত। কিন্তু বিনিময়যোগ্য দুটি পণ্যের আকার ও মূল্যের পার্থক্যের কারণে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে লেনদেনে নানাবিধ সমস্যার উদ্ভব হওয়ায় একেক সমাজে একেক মূল্যবান ধাতুকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হতো-কোথাও কড়ি, কোথাও তিমি মাছের দাঁত, কোথাও মাদুর, কোথাও পালক, কোথাও গরু, কোথাও ছাগল আবার কোথাও কুড়াল। তবে লবণই নাকি পৃথিবীর প্রথম কারেন্সি, প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় মানুষ নাকি লবণকেই কারেন্সি হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
রিফ্রিজারেশন আবিষ্কারের পূর্বে লবণ খাবার সংরক্ষণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সেই সময়ে তাই যার কাছে যত বেশী লবণ মজুত থাকত তিনি তত ধনী হিসেবে বিবেচিত হতেন। পরবর্তীতে এলো তামা, রূপা, সোনার মুদ্রা। প্রাচীনকালে মুদ্রা বলতে এই সকল ধাতব মুদ্রাকেই বোঝানো হতো। তুরস্কের লিডিয় জাতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে সর্বপ্রথম ধাতব মুদ্রা তৈরি করে, আবার ভিন্ন মতে চীনেই প্রথম ধাতব মুদ্রার প্রচলন হয়। ভারতবর্ষে এই মুদ্রা তৈরি শুরু হয় প্রায় আড়াই হাজার পূর্বে। লেনদেন, বহন ও সংরক্ষণের সুবিধার্থে সপ্তম শতাব্দীতে সর্বপ্রথম চীনে কাগজের নোটের প্রচলন শুরু হয়। কাগজের নোটও এক ধরনের মুদ্রা; একেক দেশে মুদ্রার একেক রকম নাম। কোনো দেশে ডলার, কোনো দেশে পাউন্ড, কোনো দেশে ইউরো, কোনো দেশে রুপি। বিভিন্ন দেশে এর নাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও কাজ কিন্তু একই। বাংলাদেশে মুদ্রার নাম ‘টাকা’।ভাষাবিদদের মতানুসারে ‘টাকা’ শব্দটি সংস্কৃত ‘টঙ্ক’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
ভেনিসের বণিক ও পর্যটক মার্কো পোলো মোঙ্গল শাসক কুবলাই খানের রাজত্বকালে চীন ভ্রমণ শেষে ইউরোপে গিয়ে কাগজের নোটের গল্প বললে সবাই তাকে পাগল সাব্যস্ত করে। ফলে ইউরোপে কাগজের নোটের প্রচলন হতে আরও ছয় শ বছর লেগে যায়। ১৬৫২ সনে সুইডেনে প্রথম ব্যাংক নোটের প্রবর্তন হয়। ১৭৬০ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ডলার ছাপানো হয়।
গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি একটি ব্যাংক ১৭৭০-১৭৮০ সনে সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে ব্যাংক নোটের প্রচলন করে এবং ১৮৬১ সনে সরকারি উদ্যোগে ব্যাংক নোটের মুদ্রণ শুরু হয়ে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশে কিছুদিন পাকিস্তানি টাকার প্রচলন ছিল তখন ওই টাকাগুলোতে ‘বাংলাদেশ’ লেখা স্ট্যাম্প ব্যবহৃত হতো। পাকিস্তানি মুদ্রার পরিবর্তে বাংলাদেশের মুদ্রা হিসেবে টাকার প্রথম প্রচলন শুরু হয় ৪ মার্চ ১৯৭২ সালে। টাকশালের টাকা ছাপানো শুরুর আগ পর্যন্ত ভারত, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি থেকে বাংলাদেশের নোট মুদ্রণ করে আনা হতো।
সংগ্রহ নীতিমালা অনুসরণ করে একটি ভিন্ন দেশ থেকে নোট মুদ্রণ করে সময়মতো আনা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় আমাদের দেশেই নোট মুদ্রণের একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।নোট মুদ্রণের জন্য একটি প্রেস স্থাপনের ব্যাপারে ১৯৮৩ সালে একনেকে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। তবে উদ্বোধনের পূর্বে ১৯৮৮ সালেই পরীক্ষামূলকভাবে ১ টাকা ও ১০ টাকার নোট ছাপানো হয়েছিল।
প্রথমদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রকল্প হিসেবেই এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ১৯৯২ সালে যৌথ মূলধন কোম্পানির অনুমোদন নিয়ে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বে স্বাধীন দেশের সংখ্যা দুই শতাধিক হলেও সারা পৃথিবীতে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে নোট মুদ্রণের ছাপাখানা আছে মাত্র ৬৫টি, যার মধ্যে বাংলাদেশের ‘টাকশাল’ একটি। দেশ হিসেবে ব্যাপারটা নিশ্চয় মর্যাদা ও গর্বের। প্রতিষ্ঠানটির পোষাকি নাম হচ্ছে, ‘দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড’। ইংরেজি শব্দ ‘মিন্ট’-এর বাংলা হচ্ছে টাকশাল- যেখানে ধাতব মুদ্রা বা কয়েন বানানো হয়। কিন্তু সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে টাকা ছাপানো হলেও কোনো কয়েন তৈরি হয় না; তবুও সাধারণ মানুষ এই প্রতিষ্ঠানটিকে ‘টাকশাল’ বলেই ডাকে। কম মূল্যমানের নোটগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি হাত বদল হয় এবং এই নোটগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলেও বদলিয়ে নেওয়ার জটিলতায় কেউ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয় না।
এই সকল বিবেচনায় কম মূল্যমানের কাগজি নোটের পরিবর্তে ধাতু নির্মিত কয়েন বিদেশ থেকে আমদানিী করে ইস্যু করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের জনগণ কয়েন ব্যবহারে একেবারেই অভ্যস্ত নয় এবং কয়েন ব্যবহারের অপরিহার্যতা আমাদের দেশে এখনো সৃষ্টি হয়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ট্রাম, বাস, ট্রেনে যাতায়াত বা রাস্তার ধারে স্থাপিত কোনো মেশিন থেকে কোনো পানীয় কিনতে হলে অবশ্যই কয়েন প্রয়োজন; এক্ষেত্রে কাগজের নোট ভাঙ্গিয়ে কয়েন করে নিতে হয়। আমাদের দেশে এক সময় চার আনা বা পঁচিশ পয়সার একটি কয়েন দিয়ে বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত টেলিফোন সেট থেকে কথা বলা যেত, তাও এখন নেই। কেউ পকেটে কয়েন নিয়ে ঘর থেকে বের হন না। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত সব নোটই এই টাকশালে মুদ্রণ করা হয়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের নোটের সাথে প্রতিযোগিতা করে দোয়েল পাখির ছবি সম্বলিত বাংলাদেশের ২ টাকার নোটটি রাশিয়ার অনলাইন এন্টারটেইনমেন্ট আউটলেটে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাংক নোটের মর্যাদা পেয়েছে। দেশের উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে স্মরণ করে স্মারক নোটও টাকশাল থেকে মুদ্রণ করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর
পূর্তি উপলক্ষে ৪০ টাকার স্মারক নোট মুদ্রণ করা হয় ২০১১ সালেে, ভাষা আন্দোলনের ৬০
বছর পূর্তি উপলক্ষে ৬০ টাকার স্মারক নোট মুদ্রণ করা হয় ২০১২ সালে, বাংলাদেশ জাতীয়
জাদুঘরের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১০০ টাকার স্মারক নোট ছাপানো হয় ২০১৩ সালে, দ্য
সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড’ বা টাকশালের ২৫ বছর পূর্তি
উপলক্ষে ২০১৩ সনে মুদ্রণ করা হয় ২৫ টাকার স্মারক নোট। অতি সাম্প্রতিককালে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ২০০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক নোট মুদ্রণ করা
হয়েছে। আর এই স্মারক নোটটি বৈধ মুদ্রা হিসেবেও দৈনন্দিন লেনদেনে ব্যবহার করা সম্ভব
হচ্ছে। টাকা মুদ্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আগ্রহ
প্রচুর।
প্রায় ছেষট্টি একর জায়গা নিয়ে দেশের টাকা তৈরির একমাত্র এই
কারখানাটির চারিদিকে অজস্র গাছগাছালি এবং বৃক্ষশোভিত বলেই
টাকশালের অভ্যন্তরে সব সময় পাখির কলরবে মুখরিত থাকে। শুধু
প্রাকৃতিক দিক থেকেই নয় টাকা মুদ্রণের একক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়ায় কারণে
প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে কিছুটা ভিন্নও।
লেখক: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সাবেকব্যবস্থাপনা পরিচালক, দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড বা টাকশাল

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে