অপ্রতিম হত্যায় অন্য কারণও দেখছে পরিবার
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পাহাড়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছে অপ্রতিমের পরিবার। তার মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম দুটি ঘটনার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
সোমবার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজনে শোক র্যালি ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে অপ্রতিমের মা উপস্থিত থাকতে না পারায় তার পক্ষে বক্তব্য দেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার।
অপ্রতিমের মায়ের বরাত দিয়ে কামরুন নাহার বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০ দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সালমানপুর এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে কাজ নেয়। অন্যদিকে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী প্রক্টর থাকাকালে নাহিদা বেগম এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে সহায়তা করেছিলেন এবং কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন অপ্রতিম হত্যা মামলার আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিনের গ্যাংয়ের সদস্য ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এই দুই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। একই সঙ্গে মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই কিশোরের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তুলে তাদের বয়স যথাযথভাবে যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অপ্রতিম হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তুহিন (১৯), ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর এবং জড়িত সন্দেহে মো. সিয়ামকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিয়াম ছাড়া অন্য তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার আসামিরা আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যার কথা বলেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদক, অর্থ লেনদেন বা কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তাও তদন্তে রাখা হয়েছে। আসামিদের মোবাইল ফোনের কল তালিকা যাচাই করা হচ্ছে। হত্যার পর তাদের কেউ আশ্রয় বা অন্য কোনো সহায়তা করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রকিবুল ইসলাম বলেন, তিন আসামিকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তিনজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যার কথা উঠে এসেছে। তবে এর পেছনে অর্থ কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অপ্রতিমের বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক হলে এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, বয়সে ছোট হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার সন্তান হওয়ায় অপ্রতিমের এলাকার কিছু কিশোরের সঙ্গে সখ্য ছিল। এক কিশোরকে ধার দেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার জন্যও সে চাপ দিচ্ছিল বলে তারা জানান। এ কারণে ওই কিশোরদের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে অপ্রতিমের সঙ্গে অভিযুক্তদের দেখা যাচ্ছে বলেও স্থানীয়রা জানান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, হত্যার পরও অভিযুক্তদের কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিল। এমনকি তারা অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। তুহিনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পরও তার মোবাইল ফোনে এক কিশোরের একাধিকবার কল আসছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের সময়ও এক কিশোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করছিল বলে জানা গেছে।
এদিকে অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সেখানে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি রয়েছে। প্রায় দুই দশকেও সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। লালমাই-ময়নামতি পাহাড় এলাকায় নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, চুরি ও যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক সোহেল বলেন, কুমিল্লায় একের পর এক অপরাধের ঘটনায় তারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পাশাপাশি পুরো ক্যাম্পাসকে দ্রুত সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সোমবার বিকেল ৪টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের সেখানে নেওয়া হয়। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে তাদের নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়।
মতামত দিন