Views Bangladesh Logo

চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা: ‘শুধু মানুষ মারেনি, পরিবারও শেষ করে দিয়েছে’

রংপুরের তারাগঞ্জে চোর সন্দেহে রুপলাল দাস ও তার জামাতা প্রদীপ লালকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার এক বছর পূর্ণ হলেও মামলার বিচারকাজে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। স্বজনদের অভিযোগ, ভয়াবহ ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সবাই এখনো আইনের আওতায় আসেনি। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদেরও অনেকে জামিনে রয়েছেন।

গত বছরের ৯ আগস্ট রাতে তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের বটতলা এলাকায় শুরু হয়েছিল তাদের ওপর হামলা। চোর সন্দেহে প্রথমে পথরোধ, এরপর জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর—একপর্যায়ে তা রূপ নেয় প্রকাশ্য গণপিটুনিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মারধর থেকে বাঁচতে রুপলাল ও প্রদীপ হাতজোড় করে আকুতি জানাচ্ছেন। কিন্তু উত্তেজিত জনতা তাদের ওপর হামলা চালাতে থাকে।

রুপলাল দাস ছিলেন ঘনিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা ও পেশায় মুচি। তার জামাতা প্রদীপ লাল ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঘটনার রাতে প্রদীপ শ্বশুরবাড়িতে আসছিলেন। পরদিন রুপলালের বড় মেয়ে নূপুর রানীর বিয়ের দিন ঠিক করার কথা ছিল। পথ না চেনায় প্রদীপ রুপলালকে ফোন করলে তাকে আনতে বের হন তিনি। এরপর দুজন একই ভ্যানে বাড়ির দিকে রওনা দেন।

বটতলা এলাকায় তাদের ভ্যান থামিয়ে চোর সন্দেহ করা হয়। মামলার তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় এর আগে ভ্যান চুরির ঘটনা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। প্রদীপের ভ্যানে থাকা একটি বস্তায় কিছু প্লাস্টিকের বোতল পাওয়ার পর সন্দেহ আরও বাড়ে। বোতলের ভেতরের তরল নিয়ে নানা ধরনের কথা ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় মারধর।

একপর্যায়ে বটতলা থেকে রুপলাল ও প্রদীপকে মারতে মারতে বুড়িরহাট বাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে হামলাকারীর সংখ্যা। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে আরও পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে যান।

গুরুতর আহত অবস্থায় দুজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক রুপলালকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান প্রদীপ লাল।

স্বামীকে হারিয়ে এক বছর ধরে সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন মালতী রাণী দাস। স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে তিনি বলেন, যারা রুপলালকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারা শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেনি, একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

রুপলালের মা লাচিয়া দাসের কাছে ছেলেকে হারানোর কষ্ট আরও গভীর। রুপলাল ছিলেন তার একমাত্র ছেলে। ছেলের মৃত্যুতে একদিকে যেমন মায়ের বুক খালি হয়েছে, অন্যদিকে নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ঘটনার পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সহায়তায় সাময়িকভাবে আর্থিক সংকট কিছুটা কমলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি পরিবার দুটি। উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ, সংসারের খরচ এবং নিরাপত্তা—সবকিছু নিয়েই তাদের উদ্বেগ।

এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ ছিল, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকার পরও হামলা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তৎকালীন পুলিশ সুপার একজন উপপরিদর্শকসহ ছয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।

রুপলালের স্ত্রী বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা বর্তমানে জামিনে আছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

এদিকে ঘটনার এক বছর পার হলেও বিচারিক কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে না যাওয়ায় হতাশ নিহতদের স্বজনরা। তাদের প্রশ্ন—যারা প্রকাশ্যে দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যায় অংশ নিয়েছিল, তাদের সবাই কি শেষ পর্যন্ত আইনের আওতায় আসবে?

রুপলাল ও প্রদীপের মৃত্যুর এক বছর পরও সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বরং স্বজনদের কাছে দিনটি এখন শুধু দুই মানুষের মৃত্যুর স্মৃতি নয়—এটি দুই পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা, অনিশ্চয়তা এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষার প্রতীক হয়ে আছে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ