ডালাসের রাতে ভাইকিংসদের রূপকথা
বিশ্বকাপের কিছু রাত শুধু একটি ম্যাচের ফলাফল হয়ে থাকে না, হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ। টেক্সাসের ডালাসে তেমনই এক রাত কাটাল নরওয়ে। আর্লিং হালান্ডের দেরিতে করা সেই জয়সূচক গোলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জয়ের স্বাদ পেল ভাইকিংসরা। অন্যদিকে আইভরি কোস্ট বিদায় নিল ইতিহাসের খুব কাছে গিয়েও।
বুধবার রাতে ডালাসের স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল, যাদের কেউই আগে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জিততে পারেনি। আইভরি কোস্ট এসেছিল কুরাসাওকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠে। অন্যদিকে নরওয়ে এসেছিল ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে হারের পর। তবে সেই ম্যাচে কোচ স্টেলে সোলবাকেন ইচ্ছাকৃতভাবেই হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের মতো তারকাদের বিশ্রাম দিয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন আসল লড়াই অপেক্ষা করছে এই ম্যাচে।
শুরু থেকেই ম্যাচের চিত্র ছিল আইভরি কোস্টের পক্ষে। বল দখল, আক্রমণের গতি এবং মাঠের আধিপত্য—সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল আফ্রিকার দলটি। নরওয়ে তখন অনেকটা রক্ষণ সামলে সুযোগ খুঁজছিল। হলান্ডও প্রথম দিকে ছিলেন নিষ্প্রভ, বলের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল খুবই কম। কিন্তু ফুটবলের নিয়মই এমন—যে দল বেশি চাপ দেয়, তারাই সবসময় আগে গোল পায় না।
৩৯ মিনিটে সেই সুযোগ কাজে লাগায় নরওয়ে। বক্সের বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে অ্যান্তোনিও নুসা দুর্দান্ত দক্ষতায় ভেতরে ঢুকে বাঁকানো শটে বল পাঠিয়ে দেন জালে। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের অসাধারণ অ্যাসিস্টে এগিয়ে যায় নরওয়ে ১-০ গোলে। গোলের আগে পর্যন্ত যারা বেশি আক্রমণ করছিল, সেই আইভরি কোস্টকে পেছনে ফেলে বিরতিতে এগিয়ে যায় নরওয়ে।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে হালান্ড নিজের পরিচিত ছন্দে ফেরার চেষ্টা করেন। একটি হেডার ও একটি ভলির সুযোগ পেলেও গোলের দেখা পাননি তিনি। তবে বড় মুহূর্তের জন্য যেন অপেক্ষা করছিলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার।
দ্বিতীয়ার্ধে আইভরি কোস্ট আরও আক্রমণাত্মক হয়ে মাঠে নামে। কোচ এমার্স ফায়ের পরিবর্তন কাজে দেয়। মাঠে নামানো হয় আমাদ দিয়াল্লোকে, আর তিনিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। ৭৪ মিনিটে নিকোলাস পেপের পাস ধরে নরওয়ের রক্ষণ ভেঙে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে গোল করেন দিয়াল্লো। গোলরক্ষক ওরিয়ান নাইল্যান্ডকে পরাস্ত করে সমতা ফেরান তিনি। স্টেডিয়াম তখন আইভরি কোস্টের স্বপ্নে ভাসছে—প্রথম নকআউট জয়ের আশা তখন বাস্তবের খুব কাছাকাছি।
কিন্তু নরওয়ের গল্প তখনও শেষ হয়নি। ৮৬ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। ডান দিক থেকে অস্কার ববের দুর্দান্ত পাস পেয়ে প্যাট্রিক বার্গ বল বাড়িয়ে দেন গোলমুখে দাঁড়িয়ে থাকা হালান্ডের দিকে। হালান্ডের শট ছিল শক্তির চেয়ে বেশি ছিল নিখুঁততার—একটি ছোট্ট স্পর্শেই বল জালে জড়িয়ে যায়। নরওয়ে আবার এগিয়ে যায় ২-১ গোলে। হালান্ডও পূর্ণ করেন বিশ্বকাপের ৫ গোল।
শেষ মুহূর্তে আইভরি কোস্ট মরিয়া চেষ্টা করে সমতা ফেরানোর। ইনজুরি টাইমে আমাদ দিয়াল্লোর একটি ফ্রি-কিক প্রায় গোল হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নাইল্যান্ড দুর্দান্তভাবে ঝাঁপিয়ে বলটি বারের ওপর দিয়ে সরিয়ে দেন। সাত মিনিট অতিরিক্ত সময় পার হওয়ার পর শেষ বাঁশি বাজে। নরওয়ে লিখে ফেলে নতুন ইতিহাস।
পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, আইভরি কোস্ট ম্যাচে এগিয়ে ছিল। তাদের বল দখল ছিল ৫২ শতাংশ, শট ছিল ১৪টি এবং লক্ষ্যে ছিল ৫টি। অন্যদিকে নরওয়ের বল দখল ছিল ৪৮ শতাংশ, শট ৯টি এবং লক্ষ্যে মাত্র ৩টি। কিন্তু ফুটবলের আসল জায়গায়—গোল করার দক্ষতায়—নরওয়ে ছিল এগিয়ে। মাত্র তিনটি অন-টার্গেট শট থেকেই তারা পেয়েছে দুই গোল। দুই দলই সমান ৬টি করে ফাউল করে এবং নরওয়ের আন্তোনিও নুসা একটি হলুদ কার্ড দেখলেও পুরো ম্যাচে কোনো দলই লাল কার্ড দেখেনি।
এই জয় নরওয়ের জন্য ঐতিহাসিক। এর আগে ১৯৩৮ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে নকআউটে উঠেছিল তারা, কিন্তু দুইবারই ইতালির কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল। এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জিতল তারা। অন্যদিকে আইভরি কোস্ট তিনবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে এবারই প্রথম গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়েছিল, কিন্তু শেষ ষোলোতে এসে থেমে গেল তাদের স্বপ্নের যাত্রা।
এখন নরওয়ের সামনে আরও বড় পরীক্ষা। শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ৫ জুলাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হবে সেই লড়াই। ব্রাজিলকে হারাতে পারলে হালান্ডের নরওয়ে শুধু আরেকটি ম্যাচ জিতবে না, বরং বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের গল্প লিখবে। এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের চোখ—হলান্ড কি পারবেন ব্রাজিলের দুর্গ ভাঙতে?
মতামত দিন