কেউই জান্নাতের টিকিট দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না: তারেক রহমান
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, “দুনিয়া ও আখিরাত, বেহেশত ও দোযখ—সবকিছুর একমাত্র মালিক আল্লাহ। যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। নির্বাচনের আগে একটি দল ‘এই দিব, ওই দিব’ বলছে, এমনকি বেহেশতের টিকিট দেওয়ার কথাও বলছে। যার মালিক মানুষ না, সেই জিনিসের কথা যারা বলে তারা মূলত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে এবং ‘শেরেকী’ করছে।”
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে সিলেটের ঐতিহাসিক সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম নির্বাচনী জনসভায় এক বৃদ্ধ ওমরাহ পালনকারীকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান জনসভায় উপস্থিত এক লাল টুপি পরা মুরুব্বিকে মঞ্চে ডেকে আনেন। তিনি তাকে প্রশ্ন করেন—কাবা শরীফ, পৃথিবী এবং জান্নাত-জাহান্নামের মালিক কে? ওই মুরুব্বি ও উপস্থিত জনতা সমস্বরে ‘আল্লাহ’ বলে উত্তর দিলে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারাই সাক্ষী দিলেন সবকিছুর মালিক আল্লাহ। তাহলে যারা নির্বাচনের আগে এসব দেওয়ার কথা বলে, তারা আপনাদের ঠকাচ্ছে। নির্বাচনের পরে তারা আপনাদের কী পরিমাণ ঠকাবে তা বুঝে নেন।’ তিনি আরও যোগ করেন, যারা অতীতে স্বৈরাচারকে মদত দিয়েছিল, তাদের আস্তানা কোথায় তা দেশের মানুষ জানে।
তারেক রহমান বলেন, ‘আজ এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত হওয়ার এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য, হাজারো মানুষ গত ১৫ বছরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। আপনারা আজ এখানে উপস্থিত হয়েছেন আপনাদের রাজনৈতিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য।’ তিনি বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে দেশের মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার দমন করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘তারা শুধু ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেনি। ইলিয়াস আলী, জুনায়েদ দিদারের মতো শত হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে গুম, খুন ও মামলায় জর্জরিত করা হয়েছে।’
উন্নয়নের নামে লুটপাটের অভিযোগ তুলে তারেক রহমান বলেন, ‘উন্নয়নের নাম করে গত ১৫-১৬ বছরে কিভাবে দেশের মানুষের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা আমরা দেখেছি।’ তিনি ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘২০০৫ সালে সুনামগঞ্জে বন্যার সময় ঢাকা থেকে সিলেট আসতে ঘণ্টার মতো সময় লেগেছিল, আর আজ ১০ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। লন্ডনে প্লেনে যেতে এত সময় লাগে না। এটাই তথাকথিত উন্নয়নের ফেরিস্তি।’
তিনি বলেন, তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ‘আজ আমরা একত্রিত হয়েছি সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে, যারা রাজপথে নেমে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে,’ বলেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণআন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘যেভাবে ১৯৭১ সালে মানুষ দেশকে স্বাধীন করেছিল, সেভাবেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই দেশের মানুষ স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।’
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি রচনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন চাই।’ জনতার সাড়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা কি আমার সঙ্গে আছেন এই অবস্থার পরিবর্তন করতে?’
কৃষকদের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ধানের শীষকে জয়যুক্ত করলে আমরা সারা বাংলাদেশের কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াতে পারব।’ তিনি খাল খনন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে সারা দেশে আবার খাল খনন শুরু হবে, খালে–বিলে পানি আনা হবে।’
বিদেশনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গত ১৫-১৬ বছরে কিভাবে এই দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দেওয়া হয়েছে, আমরা দেখেছি। সেজন্যই বলেছি—দিল্লি নয়, দিল্লি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’
‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা অর্ধেক পথ এসেছি। দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছি। এখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করতে হবে। ১২ তারিখে ধানের শীষকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে সেই যাত্রা শুরু হবে।”
নারী সমাজের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক মা-বোনেরা। বিএনপি সরকার গঠন করলে তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ তিনি ফ্যামিলি কার্ড চালুর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘গ্রাম–শহরের দুস্থ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে পরিবারের নারী সদস্যের মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছায়।’
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সরকার মা-বোনদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিল। আগামী দিনে বিএনপি সরকার সেই শিক্ষিত মা-বোনদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে চায়।’
যুব সমাজের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ যুবক–যুবতী আজ বেকার। আমরা তাদের বেকার রাখতে চাই না। দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, বিদেশে বসে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ‘পোস্টাল ব্যালট ডাকাতির মাধ্যমে আবার ভোট ডাকাতির চেষ্টা চলছে,’ বলেন তিনি। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গণআন্দোলনে প্রাণ হারানোদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘এই ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত অধিকার রক্ষায় সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’
বক্তব্যের এক পর্যায়ে ধর্মীয় প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘কাবা শরিফের মালিক আল্লাহ। এই পৃথিবীর মালিক আল্লাহ। যার মালিক আল্লাহ, সেটা অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না।’ তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যারা এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
শেষাংশে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি শুধু ভোটের অধিকার নয়, দেশের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী করে তুলতে চায়। কৃষক, নারী, যুবক—সব শ্রেণির মানুষের জন্য কাজ করতে চায়।’ তিনি স্লোগান উচ্চারণ করে বলেন, ‘করব কাজ, করব দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।’
জনসভা শেষে তিনি আগামী নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট চেয়ে বলেন, ‘ইনশাল্লাহ বিএনপি সরকার গঠন করলে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের আলোকে দেশ পরিচালনা করা হবে।” বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘নেতা’ তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশগড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগের সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর মানুষ গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। গুম হয়েছে, খুন হয়েছে। কিন্তু মাথা নত করেনি।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের দর্শন ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশের উন্নয়ন। আজকে সিলেট থেকে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার যাত্রা শুরু হলো।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি দল আছে, যারা আমাদের দল, আমাদের নেতার বিরুদ্ধে নানান কুৎসা রটনা করছে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। সেই দল সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। সেই দল কে কী আপনারা চিনেন? তারা কি ভোট পাবে?
এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তারেক রহমান মঞ্চে উঠেন। এসময় স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। আরও বক্তৃতা করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির, সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট-১ আসনে দলীয় প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সিলেট-২ আসনের তাহসিনা রুশদীর লুনা, সিলেট-৪ আসনের আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট-৬ আসনের ইমরান আহমদ চৌধুরী প্রমুখ।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে