আইসিডিডিআর’বির গবেষণা
হামের ভাইরাসে জিনগত কোনো পরিবর্তন নেই, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে
চলমান হাম প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নয় মাস বয়সের কম শিশুরা, যারা এখনও নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছায়নি। আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকদের এক প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই বয়সী শিশুদের মধ্যেই হাম শনাক্তের হার সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দেশে সঞ্চালিত হামের ভাইরাসে কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ মেলেনি।
গবেষকরা জানান, বাংলাদেশে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় নয় মাস বয়সে। এর আগ পর্যন্ত শিশুরা মূলত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি ও সমাজে বিদ্যমান হার্ড ইমিউনিটির ওপর নির্ভরশীল থাকে। তবে টিকা দেওয়ার পরও প্রাকৃতিক সুরক্ষা কয়েক মাসের মধ্যেই কমে যায়, ফলে তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী হাম সন্দেহভাজন ৩৪১ জন রোগীর ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। এর মধ্যে গবেষণাগার পরীক্ষায় ৩২৪ জনের হাম শনাক্ত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে—এই বয়সের ১৪১ জন শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের ফলাফল পজিটিভ এসেছে।
বয়স ও টিকাদানের অবস্থা অনুযায়ী শিশুদের চারটি ভাগে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নয় মাসের কম বয়সী, অর্থাৎ এখনও টিকা নেওয়ার উপযুক্ত হয়নি এমন ১৪৬ জনের মধ্যে ১৪২ জনের ফলাফল পজিটিভ এসেছে। টিকা নেওয়ার উপযুক্ত হলেও যারা টিকা নেয়নি, তাদের ১২৬ জনের মধ্যে ১২২ জন পজিটিভ হয়েছে। একটি ডোজ নেওয়া ৪৮ জনের মধ্যে ৪৪ জন এবং দুটি ডোজ নেওয়া ২১ জনের মধ্যে ১৬ জনের ফলাফল পজিটিভ এসেছে। গবেষকদের মতে, দুই ডোজ নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম হওয়াটা টিকার সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গবেষণায় বলা হয়, নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা টিকা পায় না এবং তারা মায়ের অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভরশীল থাকে। তবে আইসিডিডিআরবির আগের একটি ছোট পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই এই অ্যান্টিবডির মাত্রা দ্রুত কমে যায়। পর্যবেক্ষণে থাকা তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি আর শনাক্ত করা যায়নি। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণাটি মাত্র ১৬ জন শিশুর ওপর পরিচালিত হয়েছিল বলে ফলাফল নিশ্চিত করতে আরও বৃহৎ পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেন, টিকা নেওয়ার পরও কেন কিছু শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনের কারণ কী, অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে এবং শিশুরা কখন মায়ের অ্যান্টিবডি হারায়—এসব বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা চলমান রয়েছে।
গবেষকরা হামের ভাইরাসের ৫৫টি সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করেছেন, যার মধ্যে ১৮টি নমুনার সিকোয়েন্সিং করেছে আইসিডিডিআরবি এবং ৩৭টি করেছে ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর)। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব নমুনাই বি৩ জিনোটাইপের, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান প্রাদুর্ভাবেও শনাক্ত হয়েছে। ভাইরাসের এইচ প্রোটিন এপিটোপ অঞ্চলে চারটি মিউটেশন শনাক্ত হয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন, এগুলো নতুন কিছু নয়; আগে অন্যান্য দেশেও এ ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।
আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের সময় টিকার কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। তবে তদন্তে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে শনাক্তের হার তুলনামূলক কম হলেও ১৬ জন টিকাপ্রাপ্ত শিশুর সংক্রমিত হওয়ার বিষয়টি আরও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় টিকাদান। তবে জাতীয়ভাবে তুলনামূলক উচ্চ টিকাদান কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও কেন এত বড় প্রাদুর্ভাব ঘটল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মতামত দিন