যন্তর মন্তরে সিজিপির মহাসমাবেশ ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়ে দিল্লি
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দল 'কাকরোচ জনতা পার্টি'র (সিজিপি) ডাকা 'মহাসমাবেশ ও বিক্ষোভ' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে দলটির এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা আসার পর থেকেই রাজধানীজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কর্মসূচি ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো এলাকা নজরদারিতে রাখতে বসানো হয়েছে তিন শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা। এ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১২টি অস্থায়ী বন্দিশালা (ডিটেনশন সেন্টার) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত থেকেই এসব কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হয়।
সিজিপি তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ রাজধানীর যন্তর মন্তরে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে। তাদের মূল দাবি, দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। তবে এই কর্মসূচিতে যাতে রাজধানী, আশপাশের এলাকা কিংবা অন্যান্য রাজ্য থেকে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ যোগ দিতে না পারেন, সে জন্য চরম কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে নয়াদিল্লির সবকটি (৪৫টি) মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং অন্তত ২৫০টি ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে।
আন্দোলন যেন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য শুক্রবার রাত ১০টা থেকেই যন্তর মন্তর ও এর চারপাশের চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
এর আগে প্রশাসনিক নিয়মকানুন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্ভাব্য অবনতি, বিশাল জনসমাগম এবং যানজটের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে সিজিপির সমাবেশের অনুমতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিল্লি পুলিশ। কিন্তু পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচিতে অনড় অবস্থান নেওয়ায় রাজধানীতে চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন শুক্রবার দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশ প্রধানদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও সিজিপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা যেকোনো উপায়ে দিল্লিতে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণে দেশের সব পুলিশ বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সীমান্ত নজরদারি কর্তৃপক্ষকে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে নয়াদিল্লির প্রবেশদ্বার ও সীমান্ত এলাকাগুলোতে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। রাজধানীতে প্রবেশকারী প্রতিটি যানবাহনে তল্লাশি চালাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আজ নয়াদিল্লির সব মদের দোকান ও বার বন্ধ রাখার আদেশ জারি করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন সংক্রান্ত পোস্ট, বার্তা ও প্রচারণার ওপরও কড়া নজর রাখছে পুলিশ। এ ঘটনায় যুক্ত থাকা দুই শতাধিক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে বর্তমানে পুলিশের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
যন্তর মন্তর, জনপথ, ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরের চারপাশের প্রায় ১.৫ কিলোমিটার এলাকাকে 'অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কেবল এই স্পর্শকাতর এলাকাতেই ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। যন্তর মন্তরমুখী রাস্তাগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড। এ ছাড়া সমগ্র নয়াদিল্লি জেলাকে ২০টিরও বেশি জোনে ভাগ করে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশকে সহায়তা করতে সিআরপিএফের ১২০টিরও বেশি কোম্পানি মাঠে নেমেছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সার্বিক প্রস্তুতি যাচাইয়ে একাধিক স্থানে মহড়া (মক ড্রিল) চালানো হয়েছে। অন্যদিকে স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে অনবরত ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে যে, এই সমাবেশের কোনো আইনি অনুমতি নেই। তাই সাধারণ মানুষকে বেআইনি জমায়েত, সহিংসতা এবং সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে প্রশাসন।
মতামত দিন