‘ঘুষ.সাইট’-এ তিন দিনে ১৯০০ অভিযোগ, ঘুষ দাবির অঙ্ক ছাড়িয়েছে ২০ কোটি টাকা
সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে কোথায় ও কত টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে বা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, তা প্রকাশ্যে আনতে চালু হয়েছে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site)। গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই ওয়েবসাইটে নাম-পরিচয় গোপন রেখেই নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন ভুক্তভোগীরা। চালুর মাত্র তিন দিনের মধ্যে সাইটটিতে রেকর্ডসংখ্যক অভিযোগ জমা পড়েছে—সোমবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অভিযোগের সংখ্যা প্রায় ১৮০০ থেকে ১৯০০-এর মধ্যে, আর ঘুষ হিসেবে দাবি করা মোট অর্থের পরিমাণ ২১ থেকে সাড়ে ২৫ কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে, যেহেতু সাইটে প্রতি মুহূর্তে নতুন অভিযোগ যুক্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, দুই বন্ধু সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ বিদেশের একটি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন। তাদের মূল লক্ষ্য, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঘুষের অভিজ্ঞতাগুলোকে এক জায়গায় এনে কোন সরকারি দপ্তরে দুর্নীতির মাত্রা কেমন তার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা। তবে এটি কোনো তদন্ত সংস্থা বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিকল্প নয়—সাইটে প্রকাশিত প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে পরিষ্কারভাবে ‘আনভেরিফায়েড’ বা যাচাইহীন কথাটি উল্লেখ থাকে এবং উদ্যোক্তারাও কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দাবি করছেন না।
‘ঘুষ.সাইট’-এ অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া খুবই সহজ ও স্বল্প সময়ের। অভিযোগ জানাতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন হয় না, দুই মিনিটেরও কম সময়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা যায়। অভিযোগের ক্ষেত্রে পাঁচটি মূল তথ্য দিতে হয়—দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা বা অঞ্চল, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল তার ফলাফল। এ ছাড়া ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম, পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করার নিয়ম নেই। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করার চেয়ে সামগ্রিকভাবে কোন সেবা খাতে অনিয়ম বেশি হচ্ছে, সেটি তুলে ধরাই এর মূল উদ্দেশ্য।
ব্যবহারকারীদের জমা দেওয়া কোনো অভিযোগ সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্যগুলো মুছে ফেলা হয়, পাশাপাশি আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা ওয়েবসাইটের নীতিমালা ভঙ্গকারী অভিযোগগুলোও বাদ দেওয়া হয়। পর্যালোচনা শেষে অনুমোদিত অভিযোগগুলো বিভাগ, দপ্তর, সেবার ধরন, চাওয়া অর্থের পরিমাণ ও ঘটনার ফলাফল অনুযায়ী সাজিয়ে প্রকাশ করা হয়।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে ঢাকা থেকে, আট শতাধিক। এরপরের অবস্থানে আছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ ও বরিশাল—প্রতিটি বিভাগ থেকেই কয়েক ডজন থেকে কয়েকশ করে অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, প্রায় ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ, জানিয়েছেন তারা চাওয়া ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছিলেন।
সাইটে জমা পড়া অভিযোগগুলোর মধ্যে সরকারি জমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়, পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন, গাড়ির ফিটনেস সনদ ও পেনশনের ফাইল অনলাইনে হালনাগাদ করার মতো সাধারণ সরকারি সেবা ঘিরে ঘুষ দাবির অভিযোগ উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দেখা গেছে। এসব অভিযোগে ভুক্তভোগীরা লিখেছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও বাড়তি টাকা না দিলে কাজ আটকে রাখা, বারবার ঘুরিয়ে আনা কিংবা খারাপ ব্যবহারের শিকার হতে হয়েছে তাদের।
কোনো ধরনের এনজিও বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থে ওয়েবসাইটটি পরিচালনা করছেন দুই উদ্যোক্তা। তবে সাইটে সাধারণের জন্য স্বেচ্ছা অনুদানের সুযোগ রাখা হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের একজন সাইফ কবির এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি শুধু ভিজিটর সংখ্যা নয়। কোনো নাগরিক সরকারি সেবা নিতে যাওয়ার আগে যদি মানুষের অভিজ্ঞতা দেখে বুঝতে পারেন কোথায় ঘুষ চাওয়া হচ্ছে এবং অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, সেটাই হবে আমাদের আসল সাফল্য।’
মতামত দিন