ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতে ঘুরে দাঁড়াতে এনবিআর সংস্কার অপরিহার্য: অর্থমন্ত্রী
দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যার ফলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও নাগরিক সেবাদানের সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
সোমবার (১১ মে) রাতে রাজধানীর হোটেল শেরাটনে দৈনিক বণিক বার্তার ‘সোনার বাংলা’ নীতি-আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো অর্থনীতিতে রিসোর্স মোবিলাইজেশন সবচেয়ে ফান্ডামেন্টাল বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত একসময় ১০ থেকে ১১ শতাংশ থাকলেও এখন তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে নিম্ন ট্যাক্স-জিডিপি সম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে আমরা চলে গেছি। দক্ষিণ এশিয়ায়ও আমরা সবচেয়ে নিচে।’
রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফিসক্যাল স্পেস না থাকলে উন্নয়ন কর্মসূচি নেওয়া যায় না, সামাজিক কর্মসূচিও চালানো যায় না। তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও কমতে থাকে। নাগরিকদের দৈনন্দিন সেবা দেওয়া থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান বাড়ানো—সব ক্ষেত্রেই সরকারের সক্ষমতা কমে যায়। বর্তমানে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটিকে আবার বাড়ানোর বিষয়টিই সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে প্রথমেই এনবিআরের সংস্কার করতে হবে। এনবিআর রিফর্ম ইজ এ মাস্ট।’
এনবিআর সংস্কার নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নীতি ও বাস্তবায়ন (পলিসি ও এক্সিকিউশন) আলাদা করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল অসম্পূর্ণ। ওই উদ্যোগ আসলে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ছিল না। অসম্পূর্ণ সংস্কার (হাফ-বেকড রিফর্ম) বিপজ্জনক। কিছু না থাকলে বরং সুবিধা হতো। কিন্তু অসম্পূর্ণ অবস্থায় রেখে দিলে সেটা আরও সমস্যার সৃষ্টি করে।’
তিনি জানান, আগের কাঠামোটি পুনর্বিবেচনা করে নতুনভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ জন্য সংসদে বিল স্থগিত করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রথমে ওই অসম্পূর্ণ কাঠামোটি বাতিল বা সংশোধন করতে হবে, এরপর নতুনভাবে সংস্কার করতে হবে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর দুই ভাগে বিভক্ত (বাইফারকেশন) করতে চাই।’
ট্যাক্স নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহারের ওপর জোর দিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘ট্যাক্স পলিসি যারা নির্ধারণ করবে, তাদের বাংলাদেশের অর্থনীতির ডিএনএ বুঝতে হবে। দেশের প্রতিটি সেক্টরের বাস্তবতা, ব্যবসায়ীদের সমস্যা, সাধারণ মানুষের চাহিদা—সবকিছু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। শুধু অফিসে বসে হিসাব মিলানোর জন্য কর বাড়ালে হবে না। ব্যবসার পেইন বুঝতে হবে, ইন্ডাস্ট্রির পেইন বুঝতে হবে, সাধারণ মানুষের পেইন বুঝতে হবে।’
বর্তমান কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ট্যাক্স কম পড়লেই বলা হয়—এখান থেকে এত শতাংশ বাড়াও, ওখান থেকে এত শতাংশ বাড়াও। এভাবে শুধু হিসাব মেলানো যায়, কিন্তু অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা যায় না। যারা বিনিয়োগ করছে, যারা মূলধন রিজার্ভ বাড়াচ্ছে, তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করলে তারা পুনরিবিনিয়োগ করতে পারবে না। এই জায়গায় আমাদের ট্যাক্স পলিসিতে পরিবর্তন আসবে।’
প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই ট্যাক্স পলিসির সুপারিশ সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়ে আসুক। মাঝখানে অতিরিক্ত ব্যুরোক্রেটিক ট্যাঙ্গেল (প্রশাসনিক জটিলতা) থাকলে সমস্যা তৈরি হয়। আমরা টোটালি ট্রান্সপারেন্ট পলিসি চাই। ট্যাক্স-জিডিপি বাড়াতে হবে, কিন্তু এমনভাবে বাড়াতে হবে যাতে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’
মানবসম্পদ উন্নয়নে রাজস্বের সঠিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পেতে হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় বিনিয়োগের বিকল্প নেই। এই দুই খাতে বিনিয়োগ ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি সম্ভব নয়। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত এই খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। যদিও এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় যেতে পারিনি, তবে আগামী ৪-৫ বছরে এই বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বাড়বে।’
দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন যে রেমিট্যান্স আসছে, তার বড় অংশ নিম্নদক্ষ শ্রমিকদের কাছ থেকে আসছে। অথচ অনেক দেশের তুলনায় আমাদের পার ক্যাপিটা রেমিট্যান্স কম। কারণ তারা মানবসম্পদ উন্নয়নে সফল হয়েছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের রেমিট্যান্স আয় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।’
অতীতের প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর অকার্যকারিতা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে স্কিল ডেভেলপমেন্ট খাতে অনেক বিনিয়োগ হলেও তার বড় অংশ কার্যকর হয়নি। কারণ অধিকাংশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি বা সনদ ছিল না। অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন ছাড়া কোনো স্কিলিং প্রকল্প কার্যকর হয় না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভবিষ্যতে কোনো ভোকেশনাল বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া বিনিয়োগ করা হবে না। আমরা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন ছাড়া কোনো প্রকল্প হবে না।’

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে