Views Bangladesh Logo

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ, দুর্ঘটনা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, প্রাণহানি কমানো এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। দিবসটি সামনে রেখে সড়ক অবকাঠামোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি, চালকদের দক্ষতা উন্নয়ন, ট্রাফিক আইন কার্যকর করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শুধু চালক বা পথচারীর নয়। সড়কের নকশা ও ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের মান, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দিবসটি উপলক্ষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উদ্যোগে চালকদের স্বাস্থ্য ও চক্ষু পরীক্ষা, মাদক পরীক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং সড়কের সাইন, সংকেত ও রোড মার্কিং উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চালকদের দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রচারমূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তার অবকাঠামোগত উন্নয়নেও কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে ১৪০ কিলোমিটার মহাসড়ককে নিরাপত্তা করিডরে উন্নীত করা এবং প্রায় ৫০০ কিলোমিটার মহাসড়কে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোর ঝুঁকি কমানো এবং যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল নিরাপদ করা।

চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) মাধ্যমে ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৪০ হাজার নতুন চালককে চার মাসের প্রশিক্ষণ এবং ২০ হাজার পেশাদার চালককে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাফিক আইন, সড়ক সংকেত, পথচারীদের অধিকার ও নিরাপদে গাড়ি চালানোর নিয়ম সম্পর্কে তাঁদের দক্ষ করে তোলাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য।

দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সরকারের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ লক্ষ্যে ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স এবং ঢাকায় জরুরি সেবার জন্য ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্সের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কে টহল জোরদার, দুর্ঘটনা শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করে পাঁচটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবা। এ পদ্ধতির মূল ধারণা হলো, মানুষের ভুলের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেই এমন সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কম থাকে।

এদিকে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন আইনি কাঠামো প্রণয়নের কাজও এগোচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে। এতে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে জরুরি চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় পড়া মানুষকে সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ডিমেরিট পয়েন্ট এবং একই অপরাধ বারবার করলে দ্বিগুণ জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে আইনটি এখনো প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দুর্ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের ক্লান্তি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কতামূলক সংকেত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা মনে করেন, দিবসকেন্দ্রিক আয়োজনের পাশাপাশি সারা বছর দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে। চালকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, যানবাহনের ফিটনেস যাচাই এবং দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দিতে হবে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পরিবহন মালিক, শ্রমিক, চালক, যাত্রী ও পথচারীদের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতার মধ্য দিয়ে সড়কে প্রাণহানি কমিয়ে আনা। নিরাপদ যাতায়াতকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি সড়ক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ