উৎসবমুখর পরিবেশে সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ
বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ উপলক্ষে আজ সোমবার (পহেলা বৈশাখ) দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে বাঙালির জীবনের অন্যতম প্রধান উৎসব।
নববর্ষকে বরণ করে নিতে সরকারি উদ্যোগে নেয়া হয়েছে ব্যাপক আয়োজন। দিনটি উদ্যাপনে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিচ্ছেন রঙিন শোভাযাত্রা, সংগীতানুষ্ঠান, বৈশাখী মেলা ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছরের মতো এবারও আয়োজন করেছে ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা, তবে এ বছর ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’।
শুক্রবার চারুকলা অনুষদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন নামের ঘোষণা দেয়া হয়। এবারের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘নববর্ষে ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’। গত ২৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে এ প্রতিপাদ্য চূড়ান্ত করা হয়।
রাজধানীর রমনার বটমূলে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ৫৮তম আয়োজনের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নিচ্ছে। ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ থিমে ছায়ানটের এই আয়োজন শুরু হয় ভোরে রাগ ভৈরবীর সুরে গাওয়া একটি গানে।
দুই ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে থাকছে মোট ২৪টি পরিবেশনা— এর মধ্যে ৯টি দলীয় সংগীত, ১২টি একক পরিবেশনা ও ৩টি আবৃত্তি। অনুষ্ঠানটি ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেজ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে।
এই উৎসবমুখর দিনে জাতির উদ্দেশে দেয়া এক বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম, বিশ্বাস ও রীতির ভিন্নতা থাকলেও এক ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ। বৈশাখের প্রথম দিন সেই ঐক্যের প্রতীক।’
রোববার ঢাকার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে ‘সম্প্রীতি ভবন’- এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে তিনি বলেন, ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং পাহাড়ি ও সমতলের সব জাতিগোষ্ঠী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যে একটি পরিবার। সবাই নিজেদের রীতি অনুযায়ী এই উৎসব উদ্যাপন করছে।’
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতারাও নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নববর্ষে জাতিকে নতুন প্রত্যাশা ও অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের উষ্ণতা মিথ্যাচার, অন্যায়, বিশৃঙ্খলা ও অনাচারকে দূর করুক।’
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই বার্তায় বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ জাতীয় ঐক্যের এক প্রাণবন্ত প্রকাশ। এ সময় শত্রুতা ভুলে গিয়ে মানুষ আশাবাদ আর প্রাচুর্যে ভরে ওঠে।’
সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আয়োজন করছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা ও বৈশাখী মেলা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে মিষ্টি দিয়ে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করছেন শুভেচ্ছা জানিয়ে।
এ দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করছে বৈশাখী বিশেষ ক্রোড়পত্র। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত হচ্ছে বৈশাখের ঐতিহ্য ও গুরুত্ব তুলে ধরা বিশেষ অনুষ্ঠান।
উৎসবমুখর পরিবেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীসহ সারাদেশে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। র্যাব মহাপরিচালক শাহিদুর রহমান জানান, উৎসবস্থলগুলোতে নারীদের হয়রানি ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি, বিশেষ বাহিনী মোতায়েন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রম চলছে।
তিনি আরও জানান, কোনো উগ্র বা রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যাতে এই উৎসব ব্যাহত করতে না পারে, সেজন্য সারাদিনজুড়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।
পহেলা বৈশাখের এই দিনটি আজ সমগ্র জাতিকে ঐক্য, সংস্কৃতি ও আশার এক বন্ধনে আবদ্ধ করছে; নতুন বছরের জন্য সবার মনে জাগিয়ে তুলছে নতুন প্রত্যাশা।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে