মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তরে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম: সিপিডি
সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তর এবং শহরকেন্দ্রিক পাইকারদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতাই দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের উৎপাদক ও খুচরা পর্যায়ের দামের বড় ব্যবধানের অন্যতম প্রধান কারণ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুদ্দিন আল কবির।
গবেষণায় চাল, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন, ডিম, গরুর মাংস, মাছ ও মুরগি—এই ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল খুচরা বাজার থেকে উৎপাদক পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়। ঢাকা বিভাগের ১০টি বাজারের ৮২০ জন বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য নিয়ে এ জরিপ চালানো হয়।
জরিপে দেখা যায়, পণ্যভেদে উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম—১১৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে চাল ১০০ শতাংশ ও পেঁয়াজ ৮৭ শতাংশ।
ডিম, মুরগি, গরুর মাংস ও রুই মাছের মতো যেসব পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল তুলনামূলক ছোট, সেগুলোর ক্ষেত্রে দামের ব্যবধানও কম দেখা গেছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছানোর আগে যেসব পণ্যকে ফড়িয়া, বেপারি, আড়তদার, মিলার ও পাইকারের একাধিক হাত ঘুরতে হয়, সেগুলোর দাম বেড়েছে বেশি।
গবেষণা অনুযায়ী, জরিপভুক্ত ১০টির মধ্যে ছয়টি পণ্যের—পেঁয়াজ, আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন, ডিম ও রুই মাছ—প্রধান সংগ্রহের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে শহরকেন্দ্রিক পাইকাররা। গবেষকদের মতে, এই কেন্দ্রীভবন দর-কষাকষির ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও দামের অস্থিরতা বাড়িয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে ওই স্তরে সরবরাহে বিঘ্ন, মজুতদারি বা যোগসাজশ ঘটলে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, উচ্চ দামের কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে সরবরাহ ঘাটতি, ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ ও মজুতদারি। পেঁয়াজ, বেগুন, কাঁচা মরিচ, মাছ ও গরুর মাংসের ক্ষেত্রে বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পর্যায়েই কমিশন লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। মুরগি ও গরুর মাংসের ক্ষেত্রে খামারিদের নিট বিপণন মুনাফা ঋণাত্মক পাওয়া গেছে, যার প্রধান কারণ খাদ্যের উচ্চ ব্যয়।
সেমিনারে ফাহমিদা খাতুন বলেন, নিত্যপণ্যের চড়া দামের কারণে দেশের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো কেবল খাবার জোগাড় করতেই তাদের প্রায় পুরো সঞ্চয় ব্যয় করে ফেলছে, যা সামগ্রিক জীবনমানের ওপর মারাত্মক চাপ ফেলছে। তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সঞ্চয়, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, অত্যাবশ্যক সেবা ও জীবনমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন, সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিবন্ধকতা ও চাহিদা—এই তিন দিকের বাজার গতিপ্রকৃতিকে একটি দুষ্টচক্র হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে কৃষক উৎপাদক পর্যায়ে যে দাম পান আর ভোক্তা খুচরা পর্যায়ে যা পরিশোধ করেন, তার বিরাট ব্যবধানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত চার-পাঁচ বছর ধরে দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি খাদ্য মূল্যস্ফীতি। এটিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা না গেলে তা অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে এবং সবচেয়ে বেশি ভোগাবে সাধারণ মানুষকে।
গবেষণায় কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় স্তর কমানো, পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, সমবায় ও সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে কৃষক ও খুচরা বিক্রেতার জন্য বাজারের বিকল্প বাড়ানো এবং দাম ও বাজারসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া যোগসাজশ ও মজুতদারির বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার করা, সংরক্ষণ ও হিমায়িত সরবরাহ ব্যবস্থার অবকাঠামোয় বিনিয়োগ এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের চাপ—বিশেষত খাদ্য ও প্রাণিসম্পদ সেবার ব্যয়—কমাতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
মতামত দিন