Views Bangladesh Logo

বাংলাদেশে অপুষ্টির বহুমাত্রিক সংকট: খর্বতায় ভুগছে প্রতি ৪ শিশুর ১ জন

বাংলাদেশে অপুষ্টি এখন শুধু খাদ্যসংকটের বিষয় নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চারজন শিশুর একজন খর্বকায়, ১৩ শতাংশ শিশু কৃশকায় এবং অর্ধেকের বেশি গর্ভবতী নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। একই সময়ে প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের মধ্যে স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টির এই বহুমাত্রিক সংকটের কারণে প্রতিবছর দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮ শতাংশেরও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীতে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পুষ্টি কার্যক্রম সংযুক্তিকরণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, অপুষ্টি মোকাবিলায় শুধু খাদ্য সরবরাহ বাড়ালেই হবে না। এর পাশাপাশি মাতৃপুষ্টি নিশ্চিত করা, নিরাপদ পানি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের প্রধান সায়কা সিরাজ বলেন, দেশে এখনো প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের খাদ্যাভ্যাস শর্করানির্ভর। ফলে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। চর, হাওর, বস্তি এবং অন্যান্য প্রান্তিক অঞ্চলে পুষ্টিসেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরী, পোশাকশ্রমিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রবীণদের পুষ্টির বিষয়টি নীতিনির্ধারণে আরও গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, শিশুর খর্বতার পেছনে শুধু খাদ্যের অভাব দায়ী নয়। গর্ভকালীন অপুষ্টি, নিরাপদ পানির অভাব, দুর্বল স্যানিটেশন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও এর অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর জন্মের আগেই খর্বতার ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় চার লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। তবে কমিউনিটিভিত্তিক চিকিৎসা ও পুষ্টিসেবার মাধ্যমে তাদের অধিকাংশকেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৩ থেকে ৫ শতাংশ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের খর্বতার হার বর্তমান ২৪ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব বলেও মত দেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য এখনো বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। অপুষ্টির প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশে মোট রোগের প্রায় ৭০ শতাংশই অসংক্রামক রোগের আওতায় পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ডে ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় বর্তমানে কর্মরত প্রায় ৪৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি আরও এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড চালু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপুষ্টির এই ত্রিমুখী সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি পুষ্টিনির্ভর স্বাস্থ্যনীতি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং টেকসই সরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব অব্যাহত থাকবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ